উৎসবের ব্যস্ততা শুরুর আগেই শরীরকে প্রস্তুত করতে পারে ধীর ও নিয়ন্ত্রিত যোগাভ্যাস। তবে সুপ্ত বজ্রাসনে তাড়াহুড়ো নয়—স্বাচ্ছন্দ্য, শ্বাস এবং শরীরের সীমা বোঝাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Shilpa Shetty Supta Vajrasana পুজোর আগে ফিটনেস রুটিনে যোগাসন অন্তর্ভুক্ত করার অনুপ্রেরণা হতে পারে। সাজগোজ, কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া কিংবা উৎসবের অন্যান্য প্রস্তুতির পাশাপাশি এই সময় শরীরের জন্যও কিছুটা সময় রাখা দরকার। কারণ পুজোর কয়েকটি দিন শরীরের উপর স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি চাপ পড়তে পারে।
টানা বাইরে বেরনো, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এবং রাত জেগে ঠাকুর দেখা—সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে শারীরিক ধকলও জুড়ে থাকে। তাই একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগে থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলার কথা ভাবা যেতে পারে।
বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেট্টির পছন্দের সুপ্ত বজ্রাসন সেই অভ্যাসের একটি অংশ হতে পারে। তবে এই আসনের মূল কথা দ্রুত কোনও অবস্থানে পৌঁছে যাওয়া নয়। ধীরে, নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এবং শরীরের স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা মেনে করাই এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পুজোর আগে কেন নিয়মিত শরীরচর্চা?
উৎসবের সময় দৈনন্দিন রুটিন অনেকটাই বদলে যায়। বাইরে থাকার সময় বাড়ে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এবং রাত পর্যন্ত চলতে পারে ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা। কয়েক দিন ধরে এই ব্যস্ততা চললে শরীরে বাড়তি চাপ অনুভূত হওয়াই স্বাভাবিক।
ঠিক এই কারণেই পুজোর আগের সময়টিকে নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। লক্ষ্য কেবল দেখতে ফিট হওয়া নয়; বরং উৎসবের ব্যস্ততার জন্য শরীরকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করাও জরুরি।
শিল্পার যোগাভ্যাস থেকে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও এখানেই—শরীরকে জোর করে কোনও কাজ করানো নয়। নিজের শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ধৈর্য ধরে এবং প্রতিটি নড়াচড়া সম্পর্কে সচেতন থেকে এগিয়ে যেতে হবে।
শিল্পা শেট্টির পছন্দের সুপ্ত বজ্রাসন
সুপ্ত বজ্রাসন এমন একটি যোগাসন, যেখানে ধীর গতি ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি করার সময় হঠাৎ পিছনে ঝুঁকে পড়া বা দ্রুত চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়।
আসনটি শরীরের সামনের অংশে গভীর টান তৈরি করতে পারে। তাই শরীর কতটা পিছনে যেতে স্বচ্ছন্দ, সেটি বুঝতে হবে। একেক জনের নমনীয়তা একেক রকম হওয়ায় সবার অবস্থানও একই হবে না।
এই আসনের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট ভঙ্গি অনুকরণ করার চেয়ে নিজের শরীরের সংকেত বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যতটা পিছনে গেলে শরীর নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং অস্বস্তি অনুভূত হয় না, ততটাই যাওয়া উচিত।
কীভাবে শুরু করবেন সুপ্ত বজ্রাসন?
সুপ্ত বজ্রাসনের শুরু হয় বজ্রাসন থেকে। প্রথমে গোড়ালির উপর বসতে হবে। এই প্রাথমিক অবস্থানে শরীরকে স্থির রেখে তারপর ধীরে ধীরে পিছনের দিকে হেলতে হবে।
পিছনে যাওয়ার সময় প্রথমে হাতের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। তার পরে কনুই মাটিতে রেখে শরীরকে সাপোর্ট দিতে হবে। এই সমর্থন নিয়েই শরীর যতটা স্বাভাবিকভাবে পিছনের দিকে যেতে পারে, ততটাই এগোনো উচিত।
অভ্যাস ও প্রয়োজনীয় নমনীয়তা থাকলে ধীরে ধীরে পিঠ এবং মাথা মাটিতে রাখা যেতে পারে। তবে এটিকে অবশ্যই অর্জন করতেই হবে—এমন কোনও তাগিদ রাখা উচিত নয়। শরীর যদি তার আগের অবস্থানেই স্বচ্ছন্দ থাকে, সেখানেই থামতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া দরকার। পিছনে যাওয়ার সময় শরীরের ভারসাম্য, মেরুদণ্ডের অবস্থান এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে সমানভাবে নজর রাখতে হবে।

গতি নয়, নিয়ন্ত্রণই আসল
সুপ্ত বজ্রাসনে দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা আসনের মূল ভাবনার সঙ্গে যায় না। এখানে শরীরকে সময় দেওয়া জরুরি। এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে যাওয়ার সময় কোনও তাড়াহুড়ো থাকলে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে কিংবা শরীরের উপর অনিচ্ছাকৃত চাপ পড়তে পারে।
এই কারণে আসনটির বাহ্যিক চেহারার চেয়ে নড়াচড়ার মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শরীর পিছনে কতটা গেল, সেটিই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং পুরো সময় শরীর নিয়ন্ত্রণে ছিল কি না, শ্বাস স্বাভাবিক ছিল কি না এবং কোনও অংশে জোর প্রয়োগ করা হয়েছে কি না—এসবই বেশি গুরুত্ব পায়।
Shilpa Shetty Supta Vajrasana রুটিন থেকে তাই একটি সহজ শিক্ষা পাওয়া যায়: শরীরচর্চায় ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার সঙ্গে সচেতনতা ও ধৈর্যও থাকতে হবে।
শরীরের কোন অংশে কাজ করে?
শিল্পা শেট্টির কথায়, সুপ্ত বজ্রাসনের সময় শরীরের সামনের অংশে গভীর টান অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে উরুর সামনের পেশি, হিপ ফ্লেক্সর এবং পসাস পেশিতে এই স্ট্রেচ কাজ করে।
আসনটি মেরুদণ্ড, হাঁটু ও গোড়ালির নমনীয়তা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে নমনীয়তা বাড়ানোর ইচ্ছায় শরীরকে জোর করে পিছনে নেওয়া উচিত নয়। ধীর গতিতে এবং নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী নড়াচড়া করাই এখানে মূল বিষয়।
এই আসনের সময় পাঁজর বেশ খানিকটা প্রসারিত হতে পারে। ফলে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আসনটির সঙ্গে শ্বাসের প্রতি সচেতনতা যুক্ত হলে শরীরচর্চা কেবল নড়াচড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মনোযোগও সেই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, হজমের ক্ষেত্রেও সুপ্ত বজ্রাসনের উপকার রয়েছে। তবে আসনটিকে কোনও তাড়াহুড়োর সমাধান হিসেবে না দেখে নিয়মিত ও সচেতন যোগাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
শ্বাস এবং শরীরের অবস্থানে নজর
পিছনের দিকে হেলার সময় কেবল শরীরের নমনীয়তা নিয়ে ভাবলে চলবে না। মেরুদণ্ড কোন অবস্থানে রয়েছে, শরীরের ভার কোথায় পড়ছে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না—প্রতিটি বিষয়েই মনোযোগ প্রয়োজন।
শ্বাস আটকে রেখে কোনও অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করা এই আসনের সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাঁজরের প্রসারণ এবং গভীর শ্বাসের সুযোগ আসনটির গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার অংশ।
এই সচেতনতা শরীরের সঙ্গে নিজের যোগাযোগও বাড়ায়। কোথায় টান লাগছে, কোথায় অস্বস্তি শুরু হচ্ছে এবং কখন থামা প্রয়োজন—এসব সংকেত বুঝে নেওয়াই নিরাপদ অনুশীলনের ভিত্তি।
শিল্পার কাছে যোগ শুধুই ব্যায়াম নয়
শিল্পা শেট্টির কাছে যোগাসন শুধু শরীরচর্চার একটি পদ্ধতি নয়। ২০২৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সারভাইকাল চোটের পর যোগের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরে যোগ তাঁর নিয়মিত ফিটনেস রুটিনের অংশ হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে যোগ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিও বদলেছে। শরীর কতটা নমনীয় হচ্ছে, সেটির পাশাপাশি মনকে স্থির রাখা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্বাসের প্রতি সচেতন হওয়া এবং নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিও তাঁর যোগভাবনার অংশ।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই সুপ্ত বজ্রাসনের ধীর ও নিয়ন্ত্রিত চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। আসনটি করার সময় শরীরকে কোনও অবস্থানে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং শ্বাস, নড়াচড়া এবং মানসিক স্থিরতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাই প্রধান।

পুজোর ফিটনেস রুটিনে সচেতনতার জায়গা
পুজোর আগে ফিট হওয়ার ইচ্ছা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই লক্ষ্য যদি তাড়াহুড়োর কারণ হয়ে ওঠে, তা হলে শরীরচর্চার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে। সুপ্ত বজ্রাসনের মতো আসন মনে করিয়ে দেয়, ফলের চেয়ে প্রক্রিয়াটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিনের অভ্যাসে যোগাসন রাখলে সেটি যেন কোনও প্রতিযোগিতা না হয়ে ওঠে। অন্য কারও নমনীয়তা, অবস্থান কিংবা অগ্রগতির সঙ্গে নিজের শরীরকে তুলনা করার প্রয়োজন নেই। শরীর যে গতিতে স্বচ্ছন্দ, সেই গতিতেই এগোনো উচিত।
পুজোর কয়েক দিন আগে হঠাৎ কঠিন কোনও অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করার বদলে আগে থেকে নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এতে শরীরচর্চার সঙ্গে পরিচিতি তৈরি হয় এবং নিজের সীমা বোঝাও সহজ হয়।
হাঁটু বা গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে নয়
সুপ্ত বজ্রাসন প্রত্যেকের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। বিশেষ করে হাঁটু বা গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে নিজের সিদ্ধান্তে এই আসন শুরু করা উচিত নয়।
আসনটি গোড়ালির উপর বসে শুরু হয় এবং পরে শরীর পিছনের দিকে যায়। ফলে হাঁটু ও গোড়ালির অবস্থানের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনও ব্যথা বা অস্বস্তিকে উপেক্ষা করে চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
শরীরে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা না থাকলে জোর করে পিছনে যাওয়ার চেষ্টা চোটের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। তাই শরীর যদি কোনও পর্যায়ে বাধা দেয়, সেটিকে অগ্রাহ্য না করে সেই অবস্থানেই থেমে যাওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত যোগশিক্ষক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে অনুশীলন শুরু করাই ভালো। সঠিক নির্দেশনা থাকলে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা বোঝা এবং আসনের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রিতভাবে অনুসরণ করা সহজ হতে পারে।
উৎসবের আগে লক্ষ্য হোক নিয়মিত অভ্যাস
পুজোর আগে ফিট দেখানোর ইচ্ছা অনুপ্রেরণা দিতে পারে। কিন্তু কয়েক দিনে দ্রুত পরিবর্তনের চেষ্টা না করে শরীরচর্চাকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পা শেট্টির পছন্দের সুপ্ত বজ্রাসন সেই অভ্যাসে ধৈর্য ও মনোযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে। বজ্রাসন থেকে শুরু করে ধীরে পিছনে যাওয়া, হাত ও কনুই দিয়ে সাপোর্ট নেওয়া এবং প্রতিটি পর্যায়ে শ্বাসের দিকে নজর রাখা—পুরো প্রক্রিয়াই সচেতনতার দাবি করে।
পুজোর আনন্দ উপভোগ করার প্রস্তুতিতে তাই শরীরকে সময় দেওয়ার কথাও ভুললে চলবে না। লক্ষ্য থাকবে ফিট থাকা, কিন্তু শরীরকে জোর করে নয়। ধীর গতি, নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া, নিয়মিত অভ্যাস এবং নিজের সীমার প্রতি সম্মান—সুপ্ত বজ্রাসনের সবচেয়ে জরুরি বার্তা এটিই।
Read More: পুজোয় সঙ্গী ভাড়া করার আগে এই কথাগুলি না জানলেই পড়তে পারেন বড় ফাঁদে