Suvendu Adhikari Political Journey: মেদিনীপুরের ‘বুবাই’ থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

Spread the love

মেদিনীপুরের মেঠোপথ থেকে মহাকরণের লাল কার্পেট—বাংলার রাজনীতিতে এমন নাটকীয় উত্থানের গল্প খুব বেশি নেই। কাঁথির করকুলির ‘বুবাই’ আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম আন্দোলন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরপর হারানো এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে তাঁর উত্থানের ইতিহাস। Suvendu Adhikari Political Journey আজ শুধু এক নেতার সাফল্যের গল্প নয়, বরং বাংলা রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি।

বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে মেদিনীপুরের নাম নতুন নয়। স্বাধীনতার পর অবিভক্ত মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র অজয় মুখার্জি ১৯৬৭ সালে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন। প্রায় ছয় দশক পর আবার সেই মেদিনীপুর থেকেই বাংলার শাসনকেন্দ্রে উত্থান আর এক নেতার। ইতিহাস যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ করল।

১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির করকুলিতে জন্ম শুভেন্দু অধিকারীর। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বাবা শিশির অধিকারী তৎকালীন কংগ্রেস রাজনীতির পরিচিত মুখ। কিন্তু বাবার পরিচয়ের আড়ালে থেকে নয়, নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করার এক তীব্র জেদ ছিল ছোটবেলার ‘বুবাই’-এর মধ্যে। পাড়া-প্রতিবেশীরা এখনও বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল এক ধরনের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বভাব। মাঠের খেলায় দল গঠন হোক বা পাড়ার অনুষ্ঠান, শুভেন্দুই থাকতেন কেন্দ্রবিন্দুতে।

১৯৮৭ সালে কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজে কমার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক প্রবেশ। তখন বাংলার কলেজ রাজনীতিতে বাম ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য। সেই সময় দাঁড়িয়ে দু’বার কলেজের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হওয়া নিছক ঘটনা ছিল না। কলেজের সহপাঠীরা এখনও বলেন, শুভেন্দুর বক্তৃতার মধ্যে এক অদ্ভুত টান ছিল। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল আক্রমণ, তেমনই ছিল সংগঠনের বার্তা।

রাজনীতির পাশাপাশি পড়াশোনাতেও যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন তিনি। ভাল ছাত্র হিসেবে পরিচিতি ছিল কলেজজীবন থেকেই। বন্ধুদের কথায়, শুভেন্দুর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। কোনও ঘটনার তারিখ, রাজনৈতিক বক্তৃতার লাইন বা সংগঠনের পরিসংখ্যান—মুহূর্তে বলে দিতে পারতেন। পরে ২০১১ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন।

তবে ছাত্র রাজনীতি থেকে মূল রাজনীতিতে উত্তরণের পথটা সহজ ছিল না। নব্বইয়ের দশকের বাংলায় তৃণমূল স্তরে সংগঠন গড়ে তোলা মানেই ছিল দীর্ঘ লড়াই। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা নতুন গতি পায়। স্থানীয় রাজনীতিতে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই হয়ে ওঠে তাঁর মূল শক্তি।

কাঁথি কার্ড ব্যাঙ্ক, কাঁথি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক-সহ একাধিক সমবায় প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন শুভেন্দু। গ্রামের সাধারণ মানুষ, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী—সবার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজনীতির পাশাপাশি এই সমবায় আন্দোলনই তাঁর সংগঠনের ভিতকে আরও শক্তিশালী করে।

২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ধাক্কা। মুগবেড়িয়া কেন্দ্রে তৎকালীন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে পরাজিত হন তিনি। রাজনৈতিক জীবনের সেই ব্যর্থতা অনেককেই পিছিয়ে দেয়। কিন্তু শুভেন্দুর ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা হয়েছিল। পরাজয়ের পর আরও আগ্রাসীভাবে সংগঠন গড়ার কাজে নেমে পড়েন তিনি।

২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের আসল শুরু। সেই জয় শুধু একটি বিধানসভা আসনের জয় ছিল না, বরং বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উত্থানের ইঙ্গিত ছিল।

এরপরই আসে নন্দীগ্রাম আন্দোলন। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যে আন্দোলন এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছিল, সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। জমি আন্দোলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ভাষণ দ্রুত তাঁকে রাজ্যের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ করে তোলে। নন্দীগ্রামের মাটিতে তাঁর সংগঠন দক্ষতা এবং জনসংযোগ তাঁকে ‘মাঠের নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।

২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন। দিল্লির সংসদ ভবনে পৌঁছলেও তাঁর রাজনীতির মূল কেন্দ্র থেকে যায় মেদিনীপুর। ২০১৪ সালে ফের সাংসদ নির্বাচিত হয়ে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করেন। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতির থেকেও রাজ্যের মাটিতে সংগঠন গড়াতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন শুভেন্দু।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক অবশ্য আসে নন্দীগ্রামকে ঘিরেই। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বুঝিয়ে দেন, এই কেন্দ্র শুধু একটি আসন নয়, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করে। নন্দীগ্রামে মুখোমুখি হন শুভেন্দু অধিকারী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় যাঁর দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ছিলেন, সেই নেত্রীকেই নিজের রাজনৈতিক দুর্গে হারিয়ে দেন শুভেন্দু। সেই জয় তাঁকে বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখে পরিণত করে।

তারপর ২০২৬। আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণ। শুধু নন্দীগ্রাম নয়, কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেও জয়লাভ করেন শুভেন্দু। বাংলার রাজনীতিতে এই দ্বৈত জয় এক প্রতীকী বার্তা দেয়—গ্রাম বাংলার নেতা এবার শহর কলকাতার রাজনীতিতেও নিজের দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, শুভেন্দুর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা। তিনি শুধু মঞ্চের বক্তা নন, বুথ স্তরের সংগঠন নিয়েও সমানভাবে সচেতন। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম বাংলায় ঘুরে ঘুরে যে নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন, সেটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

তাঁর রাজনৈতিক স্টাইলও অনেকটাই আলাদা। একদিকে আক্রমণাত্মক বক্তৃতা, অন্যদিকে মাঠে নেমে কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—এই দুইয়ের মিশেল তাঁকে জনপ্রিয় করেছে। বিরোধীরা তাঁকে বিতর্কিত বললেও সমর্থকদের কাছে তিনি ‘ফাইটার’।

তবে শুভেন্দুর উত্থান শুধুই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলার রাজনীতির পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিনের এক রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধে জনমানসের ক্ষোভ, সংগঠনের নতুন সমীকরণ এবং গ্রাম বাংলার রাজনৈতিক পুনর্গঠন—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে শুভেন্দু অধ্যায়।

মেদিনীপুর বরাবরই বাংলার রাজনীতিতে এক বিশেষ জায়গা দখল করে এসেছে। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে খাদ্য আন্দোলন, নকশাল রাজনীতি থেকে নন্দীগ্রাম—এই জেলার রাজনৈতিক চরিত্র সবসময়ই আলাদা। সেই মাটিরই সন্তান শুভেন্দু অধিকারী। ফলে তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া শুধুই একজন নেতার সাফল্য নয়, মেদিনীপুরের রাজনৈতিক ঐতিহ্যেরও পুনরুত্থান।

ব্রিগেডের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়ার সময় হয়তো তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল করকুলির সেই গ্রাম, কলেজের দিনগুলো, নন্দীগ্রামের আন্দোলনের রাত, আর অসংখ্য রাজনৈতিক সংঘর্ষের স্মৃতি। কারণ এই পথটা কখনও মসৃণ ছিল না। হার, অপমান, দলবদল, বিতর্ক—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এগোতে হয়েছে তাঁকে।

আজ মহাকরণের দরজা তাঁর জন্য খুলে গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হওয়াই শুভেন্দুর যাত্রার শেষ নয়। বরং এখনই শুরু আসল পরীক্ষা। বিরোধী রাজনীতির আগ্রাসী নেতা থেকে প্রশাসনের মুখ হয়ে ওঠার এই রূপান্তর কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার।

মেদিনীপুরের মেঠোপথ থেকে কলকাতার ক্ষমতার অলিন্দ—এই পথটা শুধু কিলোমিটারের দূরত্ব নয়। এটি এক রাজনৈতিক অধ্যবসায়ের গল্প। গ্রামের ‘বুবাই’ থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্প। আর সেই গল্পই হয়তো আগামী দিনের বাংলা রাজনীতির নতুন অভিধান লিখবে।

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রসঙ্গ বারবার সামনে আসে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগেই বিরোধী দলনেতা হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোলা মঞ্চ থেকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেই রাজনৈতিক লড়াই নিয়েই আগে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল News Prime Times-এ।
👉 শুভেন্দু ২৬-এর ভোটেও মমতাকে হারাবেন? খোলা মঞ্চ থেকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ বিরোধী দলনেতার

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রাম থেকেই শুভেন্দুর জাতীয় পরিচিতি তৈরি হয়। পরে সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক পুঁজি তাঁকে বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন ও নির্বাচনী তথ্য সম্পর্কে আরও জানতে দেখা যেতে পারে Wikipedia – Suvendu Adhikari এবং Election Commission of India

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *