অ্যামাজন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেইনফরেস্ট। দক্ষিণ আমেরিকার নয়টি দেশে বিস্তৃত এই অরণ্য প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে।
অ্যামাজন জঙ্গলকে আমরা অনেক সময়ই পৃথিবীর ফুসফুস বলে ডাকি। এই উপমাটি এসেছে মূলত তার অপরিসীম পরিবেশগত ভূমিকার কারণে। পৃথিবীর জীবজগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অ্যামাজনের অবদান অমূল্য। এখন প্রশ্ন হলো, কেন একে ফুসফুস বলা হয়?
অ্যামাজন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেইনফরেস্ট। দক্ষিণ আমেরিকার নয়টি দেশে বিস্তৃত এই অরণ্য প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে। একে পৃথিবীর “ফুসফুস” বলা হয় মূলত এর অক্সিজেন উৎপাদন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য। ধারণা করা হয়, একা অ্যামাজন জঙ্গলই পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে। যেমন মানুষের ফুসফুস দেহকে শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেন জোগায়, ঠিক তেমনি এই অরণ্য গোটা গ্রহের জন্য অক্সিজেনের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
অ্যামাজনের প্রতিটি গাছ, লতা-গুল্ম, উদ্ভিদ দিনরাত ফটোসিন্থেসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন নিঃসরণ করে। ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্যাসের ভারসাম্য বজায় থাকে। শুধু তাই নয়, এই জঙ্গলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কার্বন সিঙ্কও বলা হয়, কারণ এটি কোটি কোটি টন কার্বন জমা করে রাখে। যদি এই জঙ্গল ধ্বংস হয়, তবে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে এবং জলবায়ু পরিবর্তন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অ্যামাজন জঙ্গল গোটা বিশ্বের বৃষ্টিপাতের ধরণকেও প্রভাবিত করে। এখানকার গাছপালা থেকে যে বাষ্পীভবন হয়, তা মেঘ তৈরি করে এবং বৃষ্টি ঘটায়। শুধু দক্ষিণ আমেরিকাই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আবহাওয়া ও জলচক্রও এই অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও অ্যামাজন অনন্য। এখানে কোটি কোটি প্রজাতির পাখি, পশু, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের অনেককেই পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। এই জীববৈচিত্র্য পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য।
অ্যামাজন জঙ্গল মানুষের ফুসফুস যেমন দেহে অক্সিজেন সরবরাহ করে, ঠিক তেমনি পৃথিবীর জন্য অক্সিজেন জোগান ও কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের মাধ্যমে গ্রহকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই একে যথার্থই বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস।
অ্যামাজন জঙ্গলকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হলেও আজকের দিনে এই অরণ্য মারাত্মক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপক হারে বনভূমি ধ্বংস, কৃষিজমি তৈরির জন্য গাছ কেটে ফেলা, পশুপালনের জন্য জমি খালি করা এবং খনিজ আহরণ এর বিশাল অংশকে বিপন্ন করে তুলছে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হেক্টর বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে, যা পৃথিবীর পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য এক বিরাট হুমকি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে অ্যামাজনের বড় অংশ একসময় মরুভূমির মতো শুকিয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও অ্যামাজনের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, অগ্নিকাণ্ড, এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত অরণ্যের প্রাণবৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আগুন লাগলে হাজার হাজার গাছপালা ধ্বংস হয়, অক্সিজেন উৎপাদন কমে যায় এবং কার্বন আবার বাতাসে মিশে জলবায়ুকে আরও উষ্ণ করে তোলে। অর্থাৎ, অ্যামাজন রক্ষার বিষয়টি কেবল দক্ষিণ আমেরিকার জন্য নয়, গোটা বিশ্বের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
এছাড়াও, অ্যামাজনের ভেতরে অসংখ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে। এই অরণ্য তাদের জীবন-জীবিকার মূল ভিত্তি। বন ধ্বংস হলে তাদের সংস্কৃতি, জীবনধারা ও অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। তাই অ্যামাজন কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি মানব সভ্যতার ইতিহাস ও বৈচিত্র্যেরও একটি ভাণ্ডার।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু দেশ ও সংগঠন অ্যামাজন সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে এসেছে। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন বনভূমি রক্ষা ও পুনর্গঠনের জন্য কাজ করছে। এমনকি বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলিও বুঝতে শুরু করেছে যে অ্যামাজন ধ্বংস হলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক চুক্তি, পরিবেশ রক্ষা নীতি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অরণ্যকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চলছে।
অ্যামাজন জঙ্গল পৃথিবীর জীবনের জন্য এক অনন্য রক্ষাকবচ। মানুষের ফুসফুস দেহকে বাঁচিয়ে রাখে, আর অ্যামাজন জঙ্গল গ্রহকে বাঁচিয়ে রাখছে। তাই একে রক্ষা করা শুধু পরিবেশবাদীদের দায়িত্ব নয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। যদি আমরা এখনই পদক্ষেপ না নেই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনব।