এস জয়শঙ্করের জন্ম হয় ৯ জানুয়ারি ১৯৫৫ সালে নয়াদিল্লিতে। তাঁর পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং বুদ্ধিজীবী। তাঁর বাবা কে. সুব্রহ্মণ্যম ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৌশলগত বিশ্লেষক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ।
ভারতের বর্তমান বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আজকের দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত। তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং সোজাসাপ্টা বক্তব্য তাঁকে শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের অনেক অজানা দিক রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে এতটা পরিচিত নয়। এই জীবনকাহিনী বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে তাঁর শৈশব ও কর্মজীবনের সূচনালগ্নে।
এস জয়শঙ্করের জন্ম হয় ৯ জানুয়ারি ১৯৫৫ সালে নয়াদিল্লিতে। তাঁর পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং বুদ্ধিজীবী। তাঁর বাবা কে. সুব্রহ্মণ্যম ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৌশলগত বিশ্লেষক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ। বাবার প্রভাবেই ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে কৌতূহল জন্মায়। জয়শঙ্করের দুই ভাইও নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত— একজন বিজ্ঞানী ও আরেকজন সাংবাদিক। অর্থাৎ গোটা পরিবারই মেধা ও প্রতিভার জন্য পরিচিত ছিল।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অনন্য। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেনস কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পরে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল “ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক”, যা সেই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক অধ্যয়ন ছিল। জেএনইউ-তে অধ্যয়নকালে তাঁর চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অনেককে মুগ্ধ করেছিল।
১৯৭৭ সালে তিনি ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরে (IFS) যোগ দেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক যাত্রা। তিনি সিঙ্গাপুর, চেকোস্লোভাকিয়া, জাপান, চীন ও আমেরিকায় গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে কাজ করেছেন। বিশেষ করে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত থাকার সময় তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ডোকলামের মতো সীমান্তসংকট, কিংবা ১৯৯০ ও ২০০০ দশকে ভারত-চীন সম্পর্কের ওঠাপড়ার সময় তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র।
অজানা এক দিক হলো, জয়শঙ্কর শুধু কূটনীতির মানুষ নন, তিনি সংস্কৃতিতেও আগ্রহী। তিনি হিন্দি, তামিল, ইংরেজি, রাশিয়ান, জাপানিজ সহ একাধিক ভাষায় দক্ষ। এর ফলে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। তাঁর এই বহুভাষিক দক্ষতা তাঁকে সবসময় অন্যদের থেকে এগিয়ে রেখেছে।
আরেকটি কম পরিচিত তথ্য হলো— তিনি নেপথ্যে থেকে বহু ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। যেমন ২০০৮ সালের ভারত-আমেরিকা অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি, যা ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। সে সময় তিনি ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ছিলেন এবং আলোচনার অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই সাফল্য তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি এনে দেয়।
অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি। ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদী তাঁকে সরাসরি দেশের বিদেশমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এটি ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা, কারণ সচরাচর কোনো অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিককে সরাসরি মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয় না। কিন্তু মোদীর আস্থা ও জয়শঙ্করের অসাধারণ দক্ষতা এই পথ খুলে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবনে জয়শঙ্করের যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর প্রথম স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে অকালেই মারা যান। পরে তিনি জাপানি বংশোদ্ভূত কূটনীতিবিদ কিয়োকো জয়শঙ্করকে বিবাহ করেন। পরিবার নিয়ে তিনি একটি শান্ত ও সাদামাটা জীবনযাপন করেন, যদিও তাঁর পেশাগত জীবন চিরকাল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে।
আজকের দিনে তিনি ভারতের কূটনীতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা প্রতিবেশী দেশ— সর্বত্র তিনি ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করে তুলেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— তিনি কথা বলেন সরাসরি, বিন্দুমাত্র ভণিতা ছাড়াই। আন্তর্জাতিক মহলে যখনই ভারতের সমালোচনা হয়েছে, তিনি ঠান্ডা মাথায় যুক্তি ও তথ্য দিয়ে তার জবাব দিয়েছেন। ফলে তাঁকে আজকের দিনে এক “স্ট্রং ফরেন মিনিস্টার” হিসেবে গণ্য করা হয়।
এস জয়শঙ্করের অজানা জীবনকাহিনী আমাদের শেখায় যে মেধা, পরিশ্রম, ধৈর্য এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই একজন মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। তিনি শুধু একজন কূটনীতিক নন, আধুনিক ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এক স্থপতি। তাঁর জীবন কাহিনী ভারতের আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা।