শাকিব খানের ক্যারিয়ারের আরেকটি অজানা দিক হলো তার আন্তর্জাতিক সাফল্য। শুধু বাংলাদেশেই নয়, কলকাতার টলিউডেও তিনি অভিনয় করেছেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত নায়কের নাম শাকিব খান। তাকে শুধু একজন অভিনেতা হিসেবেই নয়, বরং ঢালিউডের পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। যদিও তার খ্যাতি, জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের গল্প অনেকেই জানেন, তবুও তার জীবনের অনেক অজানা অধ্যায় আছে যা সাধারণ দর্শক খুব কমই শুনেছেন।
শাকিব খানের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলার মাসদাইর এলাকায়। শৈশবে তিনি ছিলেন ভীষণ চঞ্চল এবং পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার আগ্রহ ছিল প্রবল। অনেকেই জানেন না যে, শাকিব মূলত চলচ্চিত্রে আসার কোনো পরিকল্পনা করে ওঠেননি। পরিবারের ইচ্ছাতেই তিনি প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ভাগ্যের চাকা একেবারেই ভিন্ন দিকে ঘুরে যায়।
১৯৯৬ সালে তিনি আকস্মিকভাবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। মজার ব্যাপার হলো, প্রথম দিকে কেউই ভাবতে পারেননি যে এই ছেলেটিই একদিন ঢালিউডের “সুপারস্টার” খেতাব অর্জন করবে। তার প্রথম ছবি অন্যায় যুদ্ধ মুক্তি পেলেও সেভাবে আলোচনায় আসেনি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ধারাবাহিকভাবে দর্শকদের মন জয় করতে শুরু করেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি শাকিব খান ছিলেন অসাধারণ পরিশ্রমী। যখন অনেক নায়ক বছরে দু’তিনটি ছবিতে অভিনয় করতেন, তখন শাকিব বছরে ১০–১৫টিরও বেশি ছবিতে কাজ করতেন। তার এই অদম্য পরিশ্রমই তাকে ধীরে ধীরে এক নম্বর নায়কের আসনে বসিয়ে দেয়। ২০০০-এর দশকে শাকিব খানের ছবি মানেই হিট—এমন একটি ধারণা গড়ে ওঠে।
তার জীবনের একটি অজানা দিক হলো, শুরুতে তিনি ভীষণভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, তার অভিনয়ে বৈচিত্র্য নেই, নায়কোচিত ব্যক্তিত্ব নেই। কিন্তু শাকিব সমালোচনাকে কখনো ভয় পাননি। বরং প্রতিটি সমালোচনাকে তিনি নিজের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে বদলেছেন, অভিনয়ে এনেছেন নতুনত্ব, এমনকি নিজের স্টাইল তৈরি করেছেন।
শাকিব খানের ক্যারিয়ারের আরেকটি অজানা দিক হলো তার আন্তর্জাতিক সাফল্য। শুধু বাংলাদেশেই নয়, কলকাতার টলিউডেও তিনি অভিনয় করেছেন। ভারতীয় দর্শকদের কাছেও তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। শিকারি ছবিটি তার ক্যারিয়ারের বাঁক বদলের অন্যতম উদাহরণ। এ ছবির মাধ্যমে তিনি শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হন।
অভিনয় জীবনের বাইরে তিনি একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও পরিচিত। তিনি বহুবার গোপনে সাহায্য করেছেন অসহায় শিল্পীদের, এমনকি সাধারণ মানুষদেরও। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় তিনি নিজের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অনেককে সাহায্য করেছেন। তবে এসব কার্যক্রম নিয়ে তিনি কখনো প্রচার করতে চাননি।
শাকিব খানের আরেকটি অজানা দিক হলো তার সঙ্গীতপ্রেম। যদিও তিনি মূলত অভিনেতা, কিন্তু সংগীতের প্রতিও তার গভীর আগ্রহ রয়েছে। ফাঁকা সময়ে তিনি গান শুনতে ভালোবাসেন এবং অনেক সময় শখ করে গান গেয়ে থাকেন।
ব্যক্তিগত জীবনে শাকিব খান অনেক ওঠা-নামার মধ্যে দিয়ে গেছেন। নায়িকা অপু বিশ্বাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও বিবাহ নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় প্রচুর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে আজও দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন।

সবচেয়ে বড় কথা, শাকিব খানের কাহিনী হলো এক সংগ্রামী মানুষের গল্প, যিনি শূন্য থেকে শুরু করে আজ কোটি দর্শকের হৃদয়ে আসন গেড়েছেন। তার জীবন আমাদের শেখায়, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।
শাকিব খানের জীবনের অজানা অধ্যায়গুলোর মধ্যে একটি হলো তার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। ঢালিউডে যখন নায়কদের জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত আসা-যাওয়া করছিল, তখন শাকিব খান বুঝেছিলেন, টিকে থাকতে হলে শুধু অভিনয় নয়, ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমাও ধরে রাখতে হবে। এজন্য তিনি নিজের পোশাক, স্টাইল, এমনকি শরীরের গঠনেও বিশেষ যত্ন নিতে শুরু করেন। এ কারণেই দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দর্শকদের কাছে একইভাবে প্রিয় রয়েছেন।
আরেকটি বিশেষ ঘটনা হলো তার প্রযোজনায় আসা। শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি প্রযোজক হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেন। “হিরো: দ্য সুপারস্টার” নামের ছবিটি তিনি নিজেই প্রযোজনা করেন এবং সেটি বিশাল সাফল্য পায়। এই ছবির মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দেন, তিনি কেবল নায়ক নন, বরং পুরো চলচ্চিত্র শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন উদ্যোক্তাও।
শাকিব খান আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিশেষ করে লন্ডন, দুবাই এবং কলকাতার চলচ্চিত্র উৎসবে তাকে একাধিকবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেখানে তিনি শুধু তার কাজ নয়, বাংলাদেশের সিনেমা সম্পর্কেও কথা বলেছেন। এভাবে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে অজানা দিক হলো একান্তে থাকা। বাইরের জগতে তিনি যতই ব্যস্ত বা উজ্জ্বল থাকুন না কেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শান্ত-নীরব প্রকৃতির। পরিবার ও সন্তানকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি প্রায়ই বলেন, তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দর্শকের ভালোবাসা এবং ছেলের হাসিমুখ। এ দুই জিনিসই তাকে প্রতিদিন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।