Murshidabad Tourism: লোকের মুখে মুখে ‘নিমকহারাম দেউরি’ — মীরজাফরের প্রাসাদে আজও ঘোরে বিশ্বাসঘাতকতার ফিসফাস

Spread the love

মুর্শিদাবাদ— Murshidabad Tourism মানেই ইতিহাস, বিশ্বাসঘাতকতা আর নবাবি বাংলার উত্থান-পতনের কাহিনি। বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। নবাবি আমলের জৌলুস, স্বাধীনতা আর পরাধীনতার টানাপোড়েন, দেশপ্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতার গল্প—সবকিছু মিলিয়ে এই জেলা যেন সময়ের এক রহস্যময় দর্পণ। সেই মুর্শিদাবাদেরই লালবাগ ব্লকের জাফরগঞ্জে দাঁড়িয়ে আছে এক বিতর্কিত ইতিহাসবাহী স্থাপনা—মীরজাফরের প্রাসাদের প্রধান ফটক, যা আজ লোকের মুখে মুখে পরিচিত ‘নিমকহারাম দেউরি’ নামে।

এই দেউরির অলিন্দে কান পাতলে যেন এখনও শোনা যায় ষড়যন্ত্রের ফিসফাস, বিশ্বাসঘাতকতার চাপা দীর্ঘশ্বাস। ছোট্ট ছুটিতে ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের কাছে আজও এটি এক অনন্য গন্তব্য।


কে ছিলেন মীরজাফর?

বাংলার ইতিহাসে মীরজাফর এমন এক নাম, যা উচ্চারিত হলেই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা-এর সেনাপতি। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাতে জড়িয়ে পড়েন মীরজাফর। তাঁর এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে।

ইতিহাসবিদদের মতে, পলাশীর যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ। আর সেই ষড়যন্ত্রের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই জাফরগঞ্জের প্রাসাদ।


‘নিমকহারাম দেউরি’ নামের পেছনের ইতিহাস

মীরজাফরের প্রাসাদের প্রধান ফটকটি পরবর্তীকালে ‘নিমকহারাম দেউরি’ নামে পরিচিতি পায়। কথিত আছে, বাংলার নবাবের লবণ খেয়ে—অর্থাৎ রাজ্যের বেতন ও সম্মান ভোগ করেও—মীরজাফর নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। সেই কারণেই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এই নাম ছড়িয়ে পড়ে।

আজও এই নাম শুনলেই স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখেমুখে ভেসে ওঠে ক্ষোভ, বেদনা আর ইতিহাসের প্রতি এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ।


প্রাসাদ কোথায়? কীভাবে যাবেন?

এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অবস্থিত মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ ব্লকের জাফরগঞ্জ এলাকায়। বহরমপুর বা লালবাগ থেকে স্থানীয় যানবাহনে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। পর্যটকরা সাধারণত হাজারদুয়ারি, কাটরা মসজিদ বা মোতিঝিল দেখার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এখানে ঘুরে আসেন।


প্রাসাদের বর্তমান অবস্থা: ইতিহাসের ভগ্নদশা

একসময় যে প্রাসাদ ছিল বিলাসবহুল, আড়ম্বরপূর্ণ ও সেনা-সুরক্ষিত, আজ তার অস্তিত্ব প্রায় লুপ্ত। মূল প্রাসাদ ভবন আর নেই। বর্তমানে সেখানে রয়েছে ছোট দুটি ভবন, যা এখন ইমামবাড়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলি প্রায় সবসময়ই বন্ধ থাকে।

প্রধান আকর্ষণ সেই ভগ্নপ্রায় দেউরি—নিমকহারাম দেউরি। ইট-চুনের গায়ে সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। ভিতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ, শুধুমাত্র বাইরে দাঁড়িয়ে দেখেই পর্যটকরা ইতিহাসের ভার অনুভব করেন।

দেউরির ভেতর দিয়ে ঢুকলে আরও একটি গেট চোখে পড়ে। এই দ্বিতীয় গেটের ভেতরেই বর্তমান স্থাপনা অবস্থিত। একসময় এখানেই নাকি সৈন্য-সামন্ত আর কামানে ঘেরা থাকত মীরজাফরের বাসভবন।


সিরাজের বন্দিত্ব ও হত্যার বিতর্ক

স্থানীয় গাইড ও টাঙ্গাচালকদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়—সিরাজউদ্দৌল্লাকে বন্দি করে এই প্রাসাদেই হত্যা করা হয়েছিল। তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ এই মতের বিরোধিতা করেন। তাঁদের মতে, সিরাজকে এখানে বন্দি করে রাখা হলেও হত্যা করা হয় হীরাঝিল এলাকায়, যার একটি বড় অংশ বর্তমানে ভাগীরথী নদীতে তলিয়ে গেছে।

এই মতভেদই ইতিহাসকে আরও রহস্যময় করে তোলে এবং পর্যটকদের কৌতূহল বাড়ায়।


নিমকহারাম দেউরির সংলগ্ন ইমামবাড়া ও স্থাপত্য, জাফরগঞ্জ মুর্শিদাবাদ

ষড়যন্ত্রের আঁতুড়ঘর?

কথিত আছে, পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে এই প্রাসাদেই বসেছিল ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন বৈঠক। ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠি ও ঘসেটি বেগমের মোতিঝিলে যে বোঝাপড়া হয়েছিল, তার চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয় এই জাফরগঞ্জের প্রাসাদে।

সেই বৈঠকে বাংলার ভবিষ্যৎ কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়। নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা এখানেই পাকাপোক্ত হয়—এমনটাই বিশ্বাস স্থানীয়দের।


প্রবেশের নিয়ম ও পর্যটকদের অভিজ্ঞতা

বর্তমানে নিমকহারাম দেউড়ির ভিতরে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে অধিকাংশ পর্যটক বাইরে থেকেই ছবি তুলে, ইতিহাস শুনে ফিরে যান।

তবুও এই জায়গার প্রতি আকর্ষণ কমেনি। বরং রহস্য, নিষেধাজ্ঞা আর ইতিহাসের ভার মিলিয়ে এটি আরও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছে।


কেন যাবেন নিমকহারাম দেউরি?

  • বাংলার স্বাধীনতা ও পরাধীনতার ইতিহাস কাছ থেকে অনুভব করতে
  • পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী ষড়যন্ত্রের বাস্তব সাক্ষী দেখতে
  • মুর্শিদাবাদের পরিচিত পর্যটন কেন্দ্রের বাইরে এক ভিন্ন ইতিহাস জানতে
  • ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের জন্য বাস্তব লোকেশন স্টাডির সুযোগ

ছোট্ট ছুটিতে যারা ভিড় এড়িয়ে ইতিহাসের নীরব সাক্ষীদের খুঁজতে চান, তাঁদের জন্য এটি এক আদর্শ গন্তব্য।

📍 আর পড়ুন: **সাজনিকহালি থেকে কালাশ আইল্যান্ড—সুন্দরবনের অনন্য দৃশ্যাবলি**


সংরক্ষণের দাবি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমীদের দাবি—নিমকহারাম দেউরি ও সংলগ্ন স্থাপনাগুলিকে সংরক্ষণ করা হোক। উপযুক্ত সংস্কার, তথ্যফলক ও পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে উঠলে এটি মুর্শিদাবাদের অন্যতম হেরিটেজ ট্যুরিজম স্পট হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস ধ্বংস হলে শুধুই ইট-পাথর নষ্ট হয় না; হারিয়ে যায় স্মৃতি, শিক্ষা আর ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় উপলব্ধি।


উপসংহার

মুর্শিদাবাদের পথে-পথে ছড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাস—কোথাও গৌরব, কোথাও গ্লানি। নিমকহারাম দেউরি সেই গ্লানিরই এক শক্তিশালী প্রতীক। আজ ভগ্নপ্রায় হলেও এই দেউরি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বিশ্বাসঘাতকতা কীভাবে একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

ছোট্ট ছুটিতে মুর্শিদাবাদ ঘুরতে এলে হাজারদুয়ারির পাশাপাশি একবার হলেও ঘুরে যান জাফরগঞ্জের এই নীরব সাক্ষীর কাছে। ইতিহাস এখানে কথা বলে—শুধু মন দিয়ে শোনার অপেক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *