কৈলাস পর্বতের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এর শীর্ষে আরোহন করা যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা সম্ভব হলেও কৈলাসে উঠতে কেউ সক্ষম হননি।
কৈলাস পর্বত পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এবং পূজনীয় একটি স্থান। তিব্বতের মালভূমিতে অবস্থিত এই পর্বতকে ঘিরে অসংখ্য কিংবদন্তি, বিশ্বাস এবং বৈজ্ঞানিক ধাঁধা রয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি পবিত্র তীর্থস্থান হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে কৈলাস পর্বত এখনো অজানা রহস্যের আধার। হাজার বছর ধরে নানা সাধক, পর্যটক এবং গবেষক এর চারপাশ ঘুরে গিয়েছেন, কিন্তু এর প্রকৃত স্বরূপ আজও উন্মোচিত হয়নি।
কৈলাস পর্বতের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এর শীর্ষে আরোহন করা যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা সম্ভব হলেও কৈলাসে উঠতে কেউ সক্ষম হননি। বহুবার পর্বতারোহীরা চেষ্টা করেছেন, কিন্তু হয় মাঝপথে ফিরে এসেছেন অথবা অদ্ভুতভাবে মারা গেছেন। বলা হয়, এখানে প্রকৃতির এক অদৃশ্য শক্তি রয়েছে যা কাউকে শীর্ষে পৌঁছতে দেয় না। অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি দেবশক্তির সুরক্ষায় রয়েছে এবং মানুষের পক্ষে তাকে জয় করা অসম্ভব।
এর গঠনও অত্যন্ত অদ্ভুত। কৈলাসের আকার দেখতে অনেকটা নিখুঁত পিরামিডের মতো, যার প্রান্ত এবং কোণগুলো সমান্তরালভাবে সাজানো। পৃথিবীর কোনো প্রাকৃতিক পাহাড়ে এত নিখুঁত গঠন সচরাচর দেখা যায় না। গবেষকরা ধারণা করেন, এটি হয়তো অজানা কোনো ভৌগোলিক প্রক্রিয়ার ফল, আবার অনেকে মনে করেন এটি প্রাচীন কোনো সভ্যতার নির্মাণকর্ম। যদিও এ নিয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও এর জ্যামিতিক নিখুঁত আকৃতি বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৈলাসের চারপাশে ঘুরতে গিয়ে তীর্থযাত্রী ও ভ্রমণকারীরা প্রায়ই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। অনেকের দাবি, এখানে সময়ের হিসাব ঠিক থাকে না। কেউ কেউ বলেন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটলেন, অথচ বাস্তবে অল্প সময় কেটেছে। আবার অনেকে বলেন, অল্প হাঁটার মধ্যেই সময় যেন দীর্ঘ হয়ে গেল। বিজ্ঞানীরা এটিকে সময় বিকৃতি বা টাইম ডাইলেশনের মতো একটি ঘটনা বলে অনুমান করেছেন, কিন্তু এখনো এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এর চারপাশে শক্তিক্ষেত্রের উপস্থিতি। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কৈলাসকে ঘিরে নদীগুলো এক নিখুঁত বৃত্তে প্রবাহিত হচ্ছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন প্রকৃতিগত গঠন নেই। অনেক গবেষক মনে করেন, এখানে চৌম্বকীয় শক্তি অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয়, যার কারণে মানুষ এখানে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন অনুভব করে।

কৈলাস পর্বতকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাসও গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে। হিন্দু পুরাণে বলা হয়েছে, কৈলাস মহাদেব শিবের বাসস্থান। বৌদ্ধরা মনে করেন, এটি তাদের ধর্মীয় প্রতীক মাউন্ট মেরুর প্রতিরূপ। জৈনদের মতে, প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এখানেই মোক্ষ লাভ করেছিলেন। বন ধর্মের লোকদের কাছেও এটি এক পবিত্র স্থান। চারটি ভিন্ন ধর্মের মিলিত বিশ্বাস একে মানবসভ্যতার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে এক অনন্য অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
কৈলাস পর্বতকে ঘিরে আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর চারপাশে গঠিত ভৌগোলিক কাঠামো। পর্বতের কাছাকাছি থাকা মানস সরোবর ও রাক্ষসতাল নামের দুই হ্রদকে ঘিরে অসংখ্য কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। মানস সরোবরকে বলা হয় স্বর্গীয় হ্রদ, যার জলকে অমৃতের সমান ধরা হয়। অন্যদিকে রাক্ষসতালকে অশুভ শক্তির প্রতীক মনে করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুটি হ্রদ পাশাপাশি অবস্থান করলেও একটির জল মিষ্টি এবং অপরটির জল নোনা। ভূতত্ত্ববিদরা এর বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করেছেন, কিন্তু এখনও এটি অনেকটাই রহস্যময় থেকে গেছে।
তীর্থযাত্রীদের জন্য কৈলাস পর্বতের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো এর প্রদক্ষিণ বা ‘কোরা’। প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ ধরে হাজারো মানুষ প্রতি বছর প্রদক্ষিণ করেন। বিশ্বাস করা হয়, একবার কৈলাস প্রদক্ষিণ করলে জীবনের পাপমোচন হয়। তবে এই পথ অত্যন্ত দুর্গম এবং কঠিন। অনেক মানুষ প্রদক্ষিণ শেষ করতে না পেরে মাঝপথে ফিরে আসেন। অদ্ভুত বিষয় হলো, অনেক ভক্ত দাবি করেন প্রদক্ষিণের সময় তাদের শরীরে অস্বাভাবিক শক্তি সঞ্চারিত হয়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানীদের মতে, কৈলাস পর্বত হয়তো ভূ-গঠনগতভাবে পৃথিবীর একটি অত্যন্ত প্রাচীন অংশ, যার বয়স কয়েক মিলিয়ন বছর। কিছু গবেষণা বলছে, এটি ভূত্বকের এমন এক প্রাচীন ভাঁজ, যেখানে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয়। তবে এসব তথ্য এখনও প্রমাণের স্তরে পৌঁছায়নি। তাছাড়া এখানকার উচ্চতা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অপ্রবেশ্য অঞ্চল হওয়ায় গবেষণা চালানো খুব কঠিন। ফলে কৈলাসের রহস্য আজও পুরোপুরি ভেদ করা সম্ভব হয়নি।
কৈলাস পর্বত শুধু একটি ভৌগোলিক বিস্ময় নয়, এটি মানব সভ্যতার আধ্যাত্মিক ইতিহাসেরও এক অমূল্য সম্পদ। এটি ধর্ম, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানের মিলনস্থল, যেখানে বিশ্বাস ও কৌতূহল একসাথে পথ খুঁজে বেড়ায়। একদিকে ভক্তদের কাছে এটি মোক্ষ ও মুক্তির প্রতীক, অন্যদিকে বিজ্ঞানীদের কাছে এটি এক অমীমাংসিত ধাঁধা। তাই কৈলাস পর্বত চিরকালই রহস্যে মোড়া থাকবে, যতদিন না মানুষ তার আসল সত্যের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।