সত্যজিৎ রায় ছোটবেলায় ছিলেন ভীষণ আঁকিবুঁকির ভক্ত। আসলে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার আগে গ্রাফিক ডিজাইনার ও চিত্রকর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল একেবারেই শৈশব থেকে।
সত্যজিৎ রায় নামটি উচ্চারণ করলেই শুধু বাংলা সিনেমা নয়, গোটা বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের ছবি ভেসে ওঠে। তাঁর সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, বরং সমাজ-মানবজীবনের গভীরতম দিকগুলিকে ছুঁয়ে যায়। তবে তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকর্মের কিছু অজানা দিক আছে, যা অনেকেই জানেন না। সেই সব গল্পই তাঁকে আরও রহস্যময় ও মহিমান্বিত করে তোলে।
সত্যজিৎ রায় ছোটবেলায় ছিলেন ভীষণ আঁকিবুঁকির ভক্ত। আসলে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার আগে গ্রাফিক ডিজাইনার ও চিত্রকর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল একেবারেই শৈশব থেকে। এই পত্রিকার জন্যই তিনি প্রথম ইলাস্ট্রেশন আঁকা শুরু করেন। পরে যখন তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর শিল্পীসত্তা সিনেমার সেট, পোস্টার থেকে শুরু করে কভার ডিজাইন পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকে হয়তো জানেন না, সত্যজিৎ রায় সঙ্গীত নিয়েও গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি পশ্চিমী সঙ্গীত ভালোবাসলেও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতিও তাঁর অনুরাগ ছিল প্রবল। সত্যজিৎ রায় নিজের সিনেমার প্রায় সব ক’টিতেই নিজেই সঙ্গীত পরিচালনা করতেন। তাঁর ব্যবহৃত সঙ্গীত আজও শ্রোতাদের কানে বাজে—‘পথের পাঁচালী’, ‘চারুলতা’ বা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সুর আজও বাঙালির আবেগ।
আরও একটি অজানা দিক হলো, সত্যজিৎ রায় ছিলেন এক দুর্দান্ত লেখক। শিশু ও কিশোরদের জন্য তিনি ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কুর মতো চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন, যেগুলি আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তাঁর লেখা গল্পগুলিতে যেমন রোমাঞ্চ ও বিজ্ঞান কল্পনার ছোঁয়া আছে, তেমনি রয়েছে বাঙালি সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
তিনি আন্তর্জাতিক মহলেও অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। অস্কার ছাড়াও (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট), বার্লিন, ভেনিস ও কান—এই তিনটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাওয়া একমাত্র ভারতীয় তিনি। অথচ এত বড় একজন মানুষ হয়েও ছিলেন ভীষণ সাধারণ, সহজ-সরল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, তিনি কখনও ফিল্ম স্কুলে গিয়ে চলচ্চিত্র শেখেননি। নিজের পড়াশোনা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, সঙ্গীত ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সিনেমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ তৈরি হয়েছিল মাত্র ১.৫ লক্ষ টাকায়, অথচ সেটিই ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেয়।
সত্যজিৎ রায়ের জীবনের আরও এক অজানা দিক হলো তাঁর বিজ্ঞাপন দুনিয়ার কাজ। অনেকেই জানেন না, তিনি প্রথমদিকে একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি করতেন। সেখানেই তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছিল। বিজ্ঞাপনের জন্য যে সব স্কেচ, লোগো এবং ইলাস্ট্রেশন তিনি আঁকতেন, সেগুলো আলাদা বৈশিষ্ট্যে ভরা ছিল। তাঁর তৈরি বেশ কিছু বিজ্ঞাপনী নকশা আজও বিশেষজ্ঞদের কাছে অনন্য নিদর্শন।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং বহুমুখী প্রতিভাধর। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবিত পরিবেশে পড়াশোনা করার সময় তাঁর শিল্পীসত্তা বিকশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়। তিনি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।
সবশেষে উল্লেখযোগ্য যে, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সমাজে দারিদ্র্য, সম্পর্কের টানাপোড়েন, নারীর মানসিক জগৎ কিংবা শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছু তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে গেছে। আজও তরুণ প্রজন্ম তাঁর সিনেমা দেখে অনুপ্রাণিত হয়, নতুন পরিচালকরা তাঁর কাজকে পাঠ্যবইয়ের মতো অধ্যয়ন করেন। তাই তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, চিরকালীন প্রেরণা।