রোহিত শর্মাকে ‘ক্রিকেট’ খেলতে দেওয়া হয়নি!

Spread the love

ভারতীয় ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল নাম রোহিত শর্মা। ব্যাট হাতে যিনি ইতিহাস গড়েছেন, বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের জন্য এক অনন্য আসন তৈরি করেছেন, তাঁর জীবনও ছিল একসময় কঠিন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। আজ যিনি কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে বিরাজমান, সেই রোহিত শর্মার ছোটবেলার গল্প অনেকটাই ভিন্ন। তাঁর পরিবারে ক্রিকেট ছিল না কোনো প্রাধান্যের জায়গায়; বরং তাঁর বাবা একসময় চেয়েছিলেন, ছেলে পড়াশোনা করুক, ভালো চাকরি করুক, ক্রিকেটের মতো অনিশ্চিত কিছুর দিকে না যাক।

রোহিতের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৩০ এপ্রিল, নাগপুরে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি এক আলাদা আকর্ষণ ছিল তাঁর। গলির ক্রিকেটে ব্যাট হাতে তাঁর দাপট সহপাঠীদের নজর কাড়ত। কিন্তু এটুকুই ছিল তাঁর খেলাধুলার জগৎ, এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ বা অনুমতি কোনো দিক থেকেই তখন ছিল না। তাঁর বাবা গুরুনাথ শর্মা ছিলেন একটি পরিবহন সংস্থার গুদামের কেয়ারটেকার। সীমিত আয়ের সংসারে ছিল প্রচুর চাহিদা, আর সেই কারণে গুরুনাথ চাননি ছেলে ক্রিকেটের মতো অস্থির এবং আর্থিকভাবে অনিশ্চিত কেরিয়ারে পা দিক।

তাঁর বাবা মনে করতেন, খেলাধুলা ভালো শখ হতে পারে, কিন্তু জীবন গড়ার পথ হতে পারে না। ফলে রোহিত যখন স্কুলে পড়াকালীন ক্রিকেট খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাঁর বাবা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন। রোহিতকেও বলা হয়েছিল পড়াশোনার দিকে মনোযোগ দিতে, ক্রিকেট নিয়ে যেন অতিরিক্ত সময় নষ্ট না করে। এই ধরণের মানসিক চাপ এবং পরিবারিক সংকটের মাঝেও রোহিতের মধ্যে লুকিয়ে ছিল প্রবল আগ্রহ, অবিচল এক স্বপ্ন।

এই সময়ে এগিয়ে আসেন রোহিতের মামা দীনেশ লাড়। তিনি রোহিতের খেলায় প্রতিভার আঁচ পেয়ে যান এবং বুঝতে পারেন, এই ছেলের মধ্যে রয়েছে বড় কিছু করে দেখানোর সম্ভাবনা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায়, রোহিতের বাবা তাঁকে ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করাতে পারেননি। সেই কাজটি করে দেন দীনেশ লাড়। তিনি রোহিতকে নিজের কাছেই নিয়ে আসেন, মুম্বাইয়ের বোরিভলিতে। নিজের সামান্য আয়ে তিনি রোহিতকে ভর্তি করেন ‘স্বামী বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’-এর ক্রিকেট ক্যাম্পে, যেখানে বিখ্যাত কোচ দুলিপার্টু বিজয়ন (Dinesh Lad) প্রশিক্ষণ দিতেন।

এই স্কুল ও কোচই রোহিতের ক্রিকেট জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুরুতে অফ-স্পিন বোলার হিসেবে খেলা শুরু করলেও কোচের নজরে পড়ে যায় তাঁর ব্যাটিং প্রতিভা। একদিন যখন দলে অন্য কোনো ওপেনার ছিল না, তখন কোচ তাঁকে ওপেন করতে পাঠান। সেই ম্যাচে রোহিত অপরাজিত ১২০ রানের ইনিংস খেলেন, যা তাঁর জীবনের প্রথম বড় টার্নিং পয়েন্ট। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

একজন পেশাদার ক্রিকেটার থেকে ভারতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না রোহিত শর্মার‌।

রোহিতের মামা তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে দেন। নিজের ছেলের মতোই তিনি রোহিতের খাওয়া-দাওয়া, স্কুল ফি, কিটস—সবকিছুর দায়িত্ব নেন। এই আত্মত্যাগের কারণেই রোহিত ক্রিকেটকে শুধু খেলা হিসেবে নয়, একটি দায়িত্ব হিসেবেই নিয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে রোহিত বলেন, “আমার বাবা চাইতেন আমি পড়াশোনা করি, কারণ তিনিও জানতেন না খেলাধুলা করে কেউ জীবনে কতদূর যেতে পারে। কিন্তু মামা না থাকলে আমি হয়তো ক্রিকেটারই হতে পারতাম না।”

রোহিতের বাবা প্রথমদিকে ক্রিকেটের বিরোধী থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও ছেলের প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রমের সামনে মাথা নত করেন। যখন রোহিত অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পান, তখন থেকেই তাঁর বাবাও বুঝতে শুরু করেন ছেলের ভবিষ্যৎ শুধুই পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এরপর যখন রোহিত ভারতের জাতীয় দলের হয়ে খেলতে শুরু করেন এবং একের পর এক অসাধারণ ইনিংস উপহার দিতে থাকেন, তখন তাঁর বাবা ছিলেন সবচেয়ে গর্বিত একজন ব্যক্তি।

এই যাত্রায় রোহিতের মা পূর্ণিমা শর্মার ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মা হিসেবে তিনি সবসময় ছেলের পাশে থেকেছেন, খেয়াল রেখেছেন রোহিত যেন মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে। তিনি রোহিতকে সাহস জুগিয়েছেন, ঘরের ভিতরে যেন এক স্বস্তির পরিবেশ থাকে তা নিশ্চিত করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে রোহিত জানান, “মা যদি আমাকে প্রতিদিন বলতেন, পড়ো, পড়ো, ক্রিকেট নিয়ে কিছু হবে না, তাহলে আমি হয়তো মন থেকেই হাল ছেড়ে দিতাম।”

রোহিতের পরিবার আজ তাঁর গর্বিত অনুরাগী। তাঁর বাবা যিনি একসময় ক্রিকেটে যাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন, এখন প্রতিটি ম্যাচের প্রতীক্ষায় থাকেন। তাঁর মা এবং মামা তো বরাবরই তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক। রোহিত নিজেও বারবার এই কথা বলেন, তাঁর সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগ, বিশেষ করে তাঁর মামার অবদান অনস্বীকার্য।

আজ রোহিত শর্মা শুধু ভারতীয় দলের অধিনায়ক নন, তিন-তিনটি ডবল সেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটসম্যান, টি-২০’তে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করার রেকর্ডধারী, এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ওপেনার। কিন্তু এই জায়গায় আসতে তাঁর পথ মসৃণ ছিল না। প্রথমদিকে পরিবারের অমতে ক্রিকেট শুরু করেও তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা আর পরিশ্রমের সম্মিলন হলে, জীবনের যেকোনো বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *