কাঞ্চন নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জীবনের শুরুতে তাঁকে প্রায়শই রাস্তায় হেঁটে অডিশনে যেতে হতো, কারণ ভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও থাকত না।
কাঞ্চন মল্লিক আজ বাংলার একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ও হাস্যরসিক শিল্পী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাঁর জীবনের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই আর্থিক অনটন আর সংগ্রাম তাঁর জীবনের সঙ্গী ছিল। কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া কাঞ্চনের শৈশব কেটেছে খুব সাধারণভাবে। বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভাল না থাকায় অনেক সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়ত।
তাঁর বাবার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চলত। বাড়িতে প্রায়ই অভাব দেখা দিত, যার ফলে কাঞ্চনকে অল্প বয়স থেকেই বুঝে নিতে হতো জীবনের কষ্ট। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তিনি নাটকের প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে সামনে আসত নানা বাধা। পড়াশোনার পাশাপাশি মঞ্চে অভিনয় করার জন্য তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হতো।
কাঞ্চন নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জীবনের শুরুতে তাঁকে প্রায়শই রাস্তায় হেঁটে অডিশনে যেতে হতো, কারণ ভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও থাকত না। কখনো কখনো খালি পেটে থেকেও তিনি থিয়েটারের রিহার্সালে যোগ দিতেন। থিয়েটারের জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করতে গেলে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলা ও প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
শুরুর দিকে চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনে সুযোগ পাননি। তবে হাল ছেড়ে দেননি। একদিকে তিনি থিয়েটারে অভিনয় চালিয়ে যান, অন্যদিকে উপার্জনের জন্য বিভিন্ন ছোটখাটো কাজও করেছেন। তাঁর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ই তাঁকে ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে টেলিভিশন এবং পরে সিনেমার জগতে নিয়ে আসে।
আজ তিনি কমেডি থেকে শুরু করে সিরিয়াস অভিনয় – সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে সফল। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহু বছরের কষ্ট, অনাহার, অভাব-অনটন আর অবহেলার গল্প। বলা যায়, কাঞ্চন মল্লিকের জীবনের প্রথম অধ্যায় ছিল একেবারে সংগ্রামময়, আর সেই সংগ্রামের জোরেই তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।
কাঞ্চন মল্লিকের জীবনের শুরুর কষ্ট আরও গভীরভাবে বোঝা যায় তাঁর থিয়েটারের দিনগুলো থেকে। সেই সময় কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে তিনি অভিনয় করতেন, কিন্তু সেখান থেকে প্রায় কোনও পারিশ্রমিকই পেতেন না। কখনো সামান্য ভাতা মিলত, আবার অনেক সময় একেবারেই কিছু থাকত না। তবুও অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা তাঁকে থামাতে পারেনি। বহু রাত তিনি হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন, কারণ পকেটে ভাড়া দেওয়ার মতো টাকা ছিল না।
তাঁর চারপাশের মানুষও প্রথম দিকে তাঁকে নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না। অনেকে মনে করতেন, অভিনয় করে সংসার চালানো সম্ভব নয়। পরিবারের তরফ থেকেও চাপ ছিল যে তিনি যেন অন্য কোনও স্থায়ী চাকরির চেষ্টা করেন। কিন্তু কাঞ্চন নিজের স্বপ্নকে ছাড়তে চাননি। অভিনয়ের জন্য সেই সময় তিনি নিজেকে বহু কষ্টে টিকিয়ে রেখেছিলেন।
শুরুর দিনগুলিতে কাঞ্চনের জন্য খাদ্যের অভাবও বড় সমস্যা ছিল। প্রায়ই তাঁকে অল্প খাবারেই দিন কাটাতে হতো। অনেক সময় রিহার্সাল শেষে খালি পেটেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে। কিন্তু এসব কষ্টই তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত করে তুলেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, বড় হতে হলে ধৈর্য আর অধ্যবসায় ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই।
কাঞ্চন মল্লিকের হাস্যরসিক অভিনয় আজ দর্শকদের মন ভরিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবে তাঁর জীবনের হাসি-আনন্দ ছিল অনেক দুঃখ-অভিজ্ঞতার আড়ালে। তাঁর এই সংগ্রামী অতীতই তাঁকে আজকের সাফল্যের আসনে বসিয়েছে। হয়তো যদি তিনি সেই সময়ে হাল ছেড়ে দিতেন, তবে আজ বাংলার বিনোদন জগৎ এক অনন্য অভিনেতাকে হারাতো।
অবশেষে থিয়েটার থেকে টেলিভিশনে আসার সুযোগ যখন এল, তখনই তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরল। প্রথমদিকে ছোট ছোট চরিত্র পেলেও ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিভা মানুষের নজরে আসে। কমেডি চরিত্রে তিনি এক নতুন ধারা তৈরি করেন, যেখানে মঞ্চের অভিজ্ঞতা তাঁকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল। এইভাবে বহু বছরের কষ্ট ও সংগ্রাম শেষে তিনি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা ও স্থায়িত্ব অর্জন করতে সক্ষম হন।