ডেথ ভ্যালিতে মানুষের বসতি আজ নেই বললেই চলে। তবে অতীতে একাধিক খনিজ অনুসন্ধানকারী দল এখানে কাজ করেছে। বিশেষত সোনা ও বোরাক্স আহরণের জন্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে এখানে বহু শ্রমিক পাঠানো হয়েছিল।
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত “ডেথ ভ্যালি” পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় স্থান। এই উপত্যকা একদিকে যেমন ভয়ঙ্কর তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য পরিচিত, তেমনই আবার নানা অজানা রহস্য, কিংবদন্তি ও বৈজ্ঞানিক রহস্যের কারণে বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্র। ডেথ ভ্যালি শব্দটাই অনেকটা ভীতিজনক—যেখানে প্রাণ বাঁচানোই একসময় ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কেবল তাপমাত্রাই নয়, এখানে লুকিয়ে আছে বহু রহস্যময় ঘটনা, যা আজও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
ডেথ ভ্যালির সবচেয়ে বড় রহস্যগুলির মধ্যে একটি হলো “মুভিং রকস” বা চলন্ত পাথরের রহস্য। রেসট্র্যাক প্লায়া নামক শুকনো হ্রদে কয়েকশো কেজি ওজনের পাথরকে মাঝে মাঝেই দেখা যায় নিজের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এদের টেনে নেওয়ার মতো কোনও মানুষ বা প্রাণীর চিহ্ন কখনোই পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। পরে জানা যায়, শীতকালে হালকা বরফ জমে গেলে আর বাতাসের জোরে পাথরগুলো ধীরে ধীরে সরে যায়। তবে এ রহস্যের ব্যাখ্যা বের হলেও অনেকের মতে, প্রকৃত রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
এছাড়াও ডেথ ভ্যালি ভূতুড়ে কিংবদন্তিতেও ভরপুর। স্থানীয় উপজাতিদের মতে, এই মরুভূমিতে বহু আত্মা ও অশুভ শক্তির বসবাস। রাত নামলেই নাকি রহস্যময় আওয়াজ শোনা যায়, যেন কেউ ফিসফিস করছে বা হাওয়ায় ভেসে আসছে অচেনা সুর। এমনকি একাধিক পর্যটক দাবি করেছেন, তাঁরা এখানে অদ্ভুত আলো বা ছায়া দেখেছেন, যা বিজ্ঞানে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ডেথ ভ্যালি বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণতম স্থানগুলির একটি। ১৯১৩ সালে এখানে রেকর্ড করা হয়েছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা—৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচণ্ড গরম, জলের অভাব এবং শূন্যজীবন প্রকৃতি একে প্রকৃত অর্থেই মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত করেছে। তা সত্ত্বেও এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের কিছু আশ্চর্যজনক অভিযোজন ঘটেছে। মরুভূমির টিকটিকি, সাপ, শেয়াল কিংবা ক্যাকটাস গাছ আশ্চর্যজনকভাবে টিকে আছে এই কঠিন পরিবেশে।
ডেথ ভ্যালির ভৌগোলিক গঠনও এক রহস্য। এটি পৃথিবীর অন্যতম নিম্নতম স্থান—সামুদ্রিক পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৮২ ফুট নিচে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এর চারপাশে বিশাল পর্বতমালা থাকলেও মাঝখানে এমন গভীর উপত্যকা কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়েও ভূতাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। কেউ বলেন, কোটি কোটি বছর আগে টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে এই ভ্যালি তৈরি হয়েছে, আবার কেউ বলেন, এটি একসময় ছিল বিশাল হ্রদ যা শুকিয়ে গিয়ে আজকের রূপ নিয়েছে।
ডেথ ভ্যালির রহস্য এখানেই শেষ নয়। মাঝে মাঝে এখানে হঠাৎ করে তীব্র বালিঝড় শুরু হয়, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে সবকিছু ঢেকে ফেলে। আবার বর্ষাকালে অল্প সময়ের জন্য এ মরুভূমি রঙিন ফুলে ভরে ওঠে, যাকে বলা হয় “ডেথ ভ্যালি সুপারব্লুম”—যা একেবারেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য।
ডেথ ভ্যালি নিয়ে আরেকটি আশ্চর্য তথ্য হলো এখানকার শব্দতত্ত্ব। অনেক সময় মরুভূমির ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ হঠাৎ এক ধরনের রহস্যময় প্রতিধ্বনি বা অচেনা কম্পনের শব্দ শুনতে পান। স্থানীয়রা একে “ভূতের সুর” বলে উল্লেখ করে থাকেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, চরম তাপমাত্রা এবং বালির ভেতর দিয়ে বায়ুর চলাচলের ফলে এই শব্দ তৈরি হয়। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এই শব্দ কেবল বাতাসের নয়, বরং অনেকটা মানুষের কথা বলার মতো শোনায়। ফলে একে ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে।

ডেথ ভ্যালিতে মানুষের বসতি আজ নেই বললেই চলে। তবে অতীতে একাধিক খনিজ অনুসন্ধানকারী দল এখানে কাজ করেছে। বিশেষত সোনা ও বোরাক্স আহরণের জন্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে এখানে বহু শ্রমিক পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তীব্র গরম, জলাভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেখান থেকেই এই স্থানের নামকরণ হয় “ডেথ ভ্যালি”। এখনও সেই পুরনো খনির ভগ্নাবশেষ, পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি আর পুরনো যানবাহন দেখে মনে হয় যেন মৃত্যুর নিঃশব্দ সাক্ষ্য বহন করছে।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও ডেথ ভ্যালি গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলি প্রায়ই এই উপত্যকাকে মঙ্গলগ্রহ বা শুক্রগ্রহের সঙ্গে তুলনা করে। কারণ, এর উষ্ণ, শুষ্ক এবং কঠিন পরিবেশ অনেকটা অন্য গ্রহের মতো। তাই নভোচারীদের জন্য এখানে মহাকাশ অভিযানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেন তারা কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখতে পারেন।
ডেথ ভ্যালি শুধু একটি মরুভূমি নয়, পৃথিবীর এক বিশাল রহস্যময় গ্রন্থাগার। এখানে যেমন প্রকৃতির কঠোরতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে অজানা সব কাহিনি। পর্যটক, বিজ্ঞানী এবং গবেষক—সবাই এই স্থানকে ভিন্ন ভিন্ন চোখে দেখেন। কারও কাছে এটি মৃত্যুর উপত্যকা, আবার কারও কাছে এটি জীবনের রহস্যের এক অমূল্য ভাণ্ডার।