পুজোর প্যান্ডেল থেকে বিয়ের আসর—পছন্দের বড় ঝুমকো পরেও কীভাবে কানের লতির উপর চাপ, ঘর্ষণ ও অস্বস্তি কমাবেন? জেনে নিন সহজ কয়েকটি টোটকা।
Heavy Earrings Ear Pain—শাড়ি বা চুড়িদারের সঙ্গে বড় ঝুমকো পরতে ভালবাসেন যাঁরা, তাঁদের কাছে এই সমস্যাটি মোটেই অচেনা নয়। সাজ সম্পূর্ণ করতে পছন্দের দুলটি কানে পরলেন, কিন্তু কিছুক্ষণ কাটতেই কান লাল হয়ে গেল। কখনও লতি ফুলে উঠল, কখনও আবার শুরু হল অসহ্য ব্যথা।
পুজোর প্যান্ডেল হোক কিংবা বন্ধুর বিয়ের আসর, সুন্দর পোশাকের সঙ্গে একটি পেল্লাই ঝুমকো গোটা সাজটাই বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইমিটেশনের বাহারি দুলের নকশা এবং আকার দেখে অনেক সময় তা না পরে থাকা কঠিন হয়ে যায়।
সমস্যা শুরু হয় দুলটি কিছুক্ষণ কানে ঝুলে থাকার পর। প্রথমে সামান্য অস্বস্তি, তারপর ঘর্ষণ, লাল ভাব এবং ব্যথা। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই দুল খুলে ফেলতে হয়। এমনকি গয়না খুলে রাখার পরও অস্বস্তি কয়েক দিন থেকে যেতে পারে।
তাই বলে কি বড় দুল পরা বন্ধ করে দিতে হবে? মোটেই নয়। দুল পরার আগে, পরার সময় এবং ব্যবহারের পরে কয়েকটি ছোট বিষয় মাথায় রাখলে কানের উপর চাপ ও অস্বস্তি অনেকটাই সামলানো যেতে পারে।
ভারী দুল পরলে কানে ব্যথা হয় কেন?
ভারী দুলের কারণে হওয়া ব্যথার পিছনে প্রধানত দুটি বিষয় কাজ করতে পারে—ইমিটেশন গয়নার ধাতুর সঙ্গে ত্বকের প্রতিক্রিয়া এবং দুলের অতিরিক্ত ওজন।
ইমিটেশন গয়নায় ব্যবহৃত সস্তা তামা বা নিকেলের সঙ্গে ঘাম মিশলে অ্যালার্জি শুরু হতে পারে। কানের ত্বক তখন সেই ধাতুর সংস্পর্শে অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ফলে লাল ভাব, ফোলা এবং যন্ত্রণার মতো সমস্যা তৈরি হয়।
শুধু ধাতুই নয়, বড় দুলের ওজনও সমস্যার অন্যতম কারণ। ভারী দুলটি দীর্ঘ সময় ধরে কানের ফুটোয় ঝুলে থাকলে তার পুরো চাপ পড়ে ছোট্ট একটি জায়গার উপর।
দুল যত ভারী হয়, কানের ফুটোর উপর সেই টানও তত বেশি অনুভূত হতে পারে। অনুষ্ঠান দীর্ঘ হলে বা একই দুল একটানা অনেকক্ষণ পরে থাকলে অস্বস্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত এমন ভারী দুল পরার অভ্যাস থাকলে কানের ফুটো ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এমনকি অতিরিক্ত চাপের কারণে কানের লতি ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই শুধু সুন্দর নকশা দেখে দুল পরলেই হবে না। দুলের ওজন কীভাবে কানের লতির উপর পড়ছে, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দুল পরার আগে কানের লতি প্রস্তুত করুন
সাজগোজ শুরু করার সময় পোশাক, মেকআপ এবং চুলের পাশাপাশি কানের দিকেও একটু নজর দেওয়া দরকার। ভারী দুল পরার আগে কানের লতিতে সামান্য নারকেল তেল বা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
এতে ত্বক নরম থাকে। দুলের ধাতু এবং কানের ত্বকের মধ্যে সরাসরি ঘর্ষণ থেকে যে জ্বালাভাব তৈরি হতে পারে, সেটিও কমানোর সুযোগ পাওয়া যায়।
দুল পরার ঠিক আগে এই ছোট প্রস্তুতিটি নিতে খুব বেশি সময় লাগে না। অথচ সাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরে যখন দীর্ঘ সময় দুলটি কানে থাকবে, তখন এই সামান্য পদক্ষেপই আরামের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নারকেল তেল বা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ব্যবহারের উদ্দেশ্য দুলের ওজন কমানো নয়। বরং ত্বককে নরম রাখা এবং ঘর্ষণজনিত অস্বস্তি থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়াই এর কাজ।
তাই বড় ঝুমকো পরার পরিকল্পনা থাকলে সাজের প্রস্তুতির তালিকায় এই ধাপটিও রাখা যেতে পারে।

ইয়ার প্যাচ বা সার্জিক্যাল টেপে মিলতে পারে সহায়তা
ভারী দুলের পুরো ওজন যাতে সরাসরি কানের ফুটোর উপর না পড়ে, তার জন্য কানের লতির পিছনে একটি ছোট ‘ইয়ার প্যাচ’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইয়ার প্যাচ না থাকলে ছোট করে কাটা সার্জিক্যাল টেপও একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়। এটি কানের লতির পিছনের দিকে লাগানো হয়।
প্যাচ বা টেপ কানের লতিকে কিছুটা শক্ত ভিত্তি দেয়। ফলে দুলের ওজন শুধুমাত্র ফুটোর চারপাশের ছোট জায়গাটির উপর কেন্দ্রীভূত না হয়ে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দুল পরার আগে প্যাচটি সঠিক জায়গায় লাগিয়ে তার উপর দিয়ে দুলের পিন প্রবেশ করাতে হবে। বাইরে থেকে প্যাচ দেখা না গেলেও কানের লতির পিছনে এটি সহায়ক স্তর হিসেবে কাজ করে।
বিশেষ করে যেসব বড় দুলের নিচের অংশ ভারী এবং পরার পরে ক্রমাগত নিচের দিকে টানতে থাকে, সেসব ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজে আসতে পারে।
Heavy Earrings Ear Pain কমানোর প্রস্তুতিতে ইয়ার প্যাচ বা সার্জিক্যাল টেপ তাই সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায়। এতে পছন্দের দুলের নকশা বদলাতে হয় না, আবার কানের ফুটোর উপর সরাসরি চাপও কিছুটা কমানো যায়।
ঝুমকোর সঙ্গে চেন বা টানা ব্যবহার করুন
পেল্লাই ঝুমকোর সঙ্গে একটি সুন্দর চেন বা টানা ব্যবহার করলে সাজ আরও রাজকীয় হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে কানের উপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতেও এটি সাহায্য করতে পারে।
চেনটি দুলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চুলে আটকানো থাকে। ফলে দুলের সম্পূর্ণ ওজন আর শুধু কানের ফুটোর উপর নির্ভর করে না।
ওজনের একটি অংশ চুলের দিকে ছড়িয়ে যায়। কানের লতির উপর নিচের দিকে যে টান তৈরি হচ্ছিল, সেটিও তুলনামূলকভাবে কম অনুভূত হতে পারে।
অর্থাৎ এই কৌশলে সৌন্দর্য এবং স্বস্তি—দুই দিকই বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে। বড় ঝুমকোর সঙ্গে মানানসই চেন ব্যবহার করলে গয়নাটি আরও জমকালো দেখায়, অথচ কানের উপর চাপ ভাগ হয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে বড় দুল পরে থাকার পরিকল্পনা থাকলে চেন বা টানা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা যেতে পারে। শেষ মুহূর্তে শুধু দুলটি পরে বেরিয়ে যাওয়ার বদলে কীভাবে সেটিকে সাপোর্ট দেওয়া যায়, সেই দিকটিও ভাবা দরকার।
পরার আগে দুল পরিষ্কার করে নিন
ইমিটেশনের দুল ব্যবহারের আগে সেটি মুছে নেওয়া জরুরি। দীর্ঘদিন গয়নার বাক্সে রাখা থাকলে দুলের গায়ে ধুলোবালি জমে থাকতে পারে।
আগে ব্যবহার করা দুলও পরিষ্কার না করে আবার কানে পরা ঠিক নয়। জমে থাকা ধুলো বা জীবাণু কানের ভিতরে গিয়ে সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
তাই সাজের সময় তাড়াহুড়ো করে বাক্স থেকে দুল বের করে সরাসরি কানে পরার বদলে প্রথমে সেটি ভালভাবে মুছে নেওয়া উচিত।
দুলের যে অংশটি কানের ফুটোর ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে, সেটির পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার। পাশাপাশি দুলের পিছনের আটকানোর অংশটিও মুছে নেওয়া যেতে পারে।
এই অভ্যাসটি খুবই ছোট, কিন্তু ভারী ইমিটেশনের দুল ব্যবহারের সম্পূর্ণ প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিষ্কার দুল ব্যবহার করলে জমে থাকা ময়লা বা জীবাণুর কারণে তৈরি হতে পারে এমন অস্বস্তির সম্ভাবনা কমানো যায়।
একটানা পরে না থেকে কানকে বিশ্রাম দিন
কোনও বিয়ে, পুজো বা বিশেষ অনুষ্ঠানে ছবি ও ভিডিয়ো তোলার জন্য বড় দুল পরা স্বাভাবিক। কিন্তু সাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে সেটি একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে থাকতেই হবে, এমন নয়।
ছবি, ভিডিয়ো বা রিল শুট করা শেষ হলে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য দুলটি খুলে রাখা যেতে পারে। এতে কান জোড়া একটু বিশ্রাম পায়।
ভারী গয়নার চাপ থেকে বিরতি পেলে কানের ফুটো এবং লতির উপর অবিরাম টান থাকে না। পরে প্রয়োজন হলে আবার দুল পরা যেতে পারে।
এই বিরতির অভ্যাস বিশেষ করে দীর্ঘ অনুষ্ঠানে কার্যকর হতে পারে। অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুল পরে থাকার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি ব্যবহার করলে চাপের সময়ও কমে যায়।
দুল খুলে রাখার সময় সেটিকে পরিষ্কার এবং নিরাপদ জায়গায় রাখা দরকার, যাতে পরে আবার ব্যবহার করতে অসুবিধা না হয়।

সাজের আগে তৈরি করুন ছোট্ট পরিকল্পনা
বড় দুল পরার প্রস্তুতি শুধু পোশাকের সঙ্গে গয়নার রং মেলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কীভাবে দুলটি পরিষ্কার করবেন, কানের লতিতে কী লাগাবেন, প্যাচ প্রয়োজন হবে কি না এবং চেন ব্যবহার করা যাবে কি না—এসবও আগে থেকে ভাবা যেতে পারে।
প্রথমে দুলটি মুছে পরিষ্কার করে নিন। এরপর কানের লতিতে সামান্য নারকেল তেল বা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগান।
দুলটি খুব ভারী হলে কানের পিছনে ইয়ার প্যাচ বা সার্জিক্যাল টেপ লাগিয়ে নিন। প্রয়োজনে দুলের সঙ্গে চেন বা টানা জুড়ে চুলে আটকে দিন।
অনুষ্ঠানে পৌঁছনোর পর কানে অতিরিক্ত চাপ অনুভব হচ্ছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখুন। ছবি বা রিল তোলা শেষ হলে সুযোগ পেলেই কিছু সময়ের জন্য দুল খুলে কানকে বিশ্রাম দিন।
এই কয়েকটি ধাপ আলাদা করে জটিল মনে হলেও বাস্তবে খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতি। অথচ ভারী গয়না পরে স্বচ্ছন্দ থাকার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
অস্বস্তি উপেক্ষা করে সাজ ধরে রাখবেন না
বড় দুল দেখতে সুন্দর বলেই কানের লাল ভাব, ফোলা বা ব্যথাকে উপেক্ষা করে সেটি পরে থাকা উচিত নয়। কারণ এই অস্বস্তিই বোঝায় যে কানের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
একটানা ভারী দুল পরে থাকলে ফুটোর উপর টান চলতেই থাকে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাসের ফলে ফুটো বড় হওয়া বা লতি ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে।
সুতরাং অনুষ্ঠানের মাঝখানে অস্বস্তি শুরু হলে কিছুক্ষণের জন্য দুল খুলে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সাজের জন্য কানকে অযথা কষ্ট দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ফ্যাশনের সঙ্গে আপস না করেও ব্যবহারের সময়টুকু ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রয়োজনের সময় দুল পরা এবং মাঝেমধ্যে খুলে বিশ্রাম দেওয়া—এই ভারসাম্যই সাজকে আনন্দদায়ক রাখতে পারে।
পাঁচটি কথা এক নজরে
ভারী দুল পরার আগে কানের লতিতে সামান্য নারকেল তেল বা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
কানের ফুটোর পিছনে ছোট ইয়ার প্যাচ বা সার্জিক্যাল টেপ ব্যবহার করলে দুলের চাপ সরাসরি ফুটোর উপর পড়ে না।
ঝুমকোর সঙ্গে চেন বা টানা লাগালে ওজনের একটি অংশ চুলের উপর ছড়িয়ে যেতে পারে।
দুল ব্যবহারের আগে সেটি মুছে পরিষ্কার করা দরকার, যাতে জমে থাকা ধুলোবালি বা জীবাণু কানের ভিতরে না যায়।
ছবি, ভিডিয়ো বা রিল তোলা হয়ে গেলে অন্তত কিছু সময়ের জন্য গয়না খুলে কানকে বিশ্রাম দেওয়া উচিত।
ফ্যাশনও থাকবে, স্বস্তিও বজায় থাকবে
পছন্দের বড় ঝুমকো সাজে আলাদা আকর্ষণ যোগ করে। কিন্তু দুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি কানের স্বস্তির কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
ইমিটেশনের ধাতু, ঘাম, ঘর্ষণ এবং গয়নার ওজন—সব মিলিয়েই কানের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই ভারী দুল পরার আগে সামান্য প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে সহজ পথ।
নারকেল তেল বা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, ইয়ার প্যাচ বা সার্জিক্যাল টেপ, দুলের চেন, পরিচ্ছন্নতা এবং মাঝেমধ্যে বিরতি—এই ছোট বিষয়গুলো একসঙ্গে কানের উপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
Heavy Earrings Ear Pain যেন উৎসব বা অনুষ্ঠানের আনন্দ নষ্ট না করে, তার জন্য প্রয়োজন শুধু একটু আগাম পরিকল্পনা। তাতেই পছন্দের ঝুমকো থাকবে, সাজও জমবে এবং কানও পাবে প্রয়োজনীয় স্বস্তি।