কলকাতা: Suvendu Adhikari alleges যে ভোটের আগে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু না হলেও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দৃশ্যমান প্রচার চালানোর বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, জেলাশাসকদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের ঘোষণাকে জনসমক্ষে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে ভোটের আগে উন্নয়নের ছবি তৈরি করা যায়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রচারের ওপর জোর বাড়ানো হচ্ছে এবং প্রকৃত কাজের তুলনায় প্রচার সামনে আনা হচ্ছে—এটাই ভোটের আগে নতুন রাজনৈতিক কৌশল।
বিরোধী পক্ষের অভিযোগের বিপরীতে, রাজ্যের শাসকদল ও প্রশাসন বলছে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবে চলছে এবং প্রচার কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রকল্প গ্রহণকারীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার অংশ। দুই পক্ষের বক্তব্য আর প্রতিদ্বন্দ্বী মতামতের কারণে বিষয়টি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
৯১১৪টি প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ে অভিযোগ
শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনা ও টেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, রাজ্য প্রশাসন প্রায় নয় হাজারের বেশি পরিকল্পনা—যার সংখ্যা তাঁর ভাষায় ৯১১৪—এই প্রকল্পগুলির টেন্ডার ডেকেছে এবং মোট আর্থিক পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। তাঁর দাবি, এত বিপুল সংখ্যক প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হলেও প্রকৃত অর্থ বরাদ্দ রয়েছে মাত্র দশ শতাংশ।
তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা যথাযথভাবে না থাকলে এর বাস্তব কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু জেলাশাসকদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে প্রকল্প ঘোষণার অনুষ্ঠান, শিলান্যাস, বড় জনসমাগম, এবং বিভিন্ন প্রচারমূলক ব্যানার, পোস্টার, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র ভোটের আগে মানুষের মনে উন্নয়নের ভাবনা তৈরি করার কৌশল।
সংবাদ সম্মেলনে শুভেন্দু বলেন, “এটি নির্বাচনমুখী কাজ। প্রকল্পের বাস্তবে কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরাদ্দ টাকা মাত্র দশ শতাংশ। তবুও প্রচার চালিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। সরকার জানে বাকি টাকা দেওয়া হবে না, কিন্তু পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন ভোটের আগে উন্নয়নের ছবি তৈরি করা যায়।”
জেলাশাসকদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের জন্ম
অভিযোগ উঠেছে, প্রধান সচিব মনোজ পন্থের নেতৃত্বে জেলাশাসকদের একটি বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাড়ি নির্মাণ প্রকল্প, রাস্তা তৈরি, জল সরবরাহ, ‘আমার পাড়া, আমাদের সমাধান’সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের প্রচারে জোর দিতে। বিরোধী পক্ষের দাবি, প্রকৃত কাজ না হলেও প্রচার যেন দৃশ্যমান হয়, সেই ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
শুভেন্দুর দাবি, প্রকল্পের শিলান্যাসের পর প্রত্যেক গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় একটি করে সভা আয়োজন করতে বলা হয়েছে। সেখানে অন্তত পাঁচশত মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং উপস্থিতদের অর্ধেক নারী হতে হবে—এমনই নির্দেশ এসেছে। এই অভিযোগে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক কাজের স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে।
দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের সভা ও প্রচার সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। এর বিপরীতে বিরোধীর দাবি, উন্নয়ন নয়, এটি প্রচারের আয়োজন মাত্র। ফলে প্রশাসনিক সভার নির্দেশনা এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
নতুন যোগদান—ভোটের আগে বিজেপির বিস্তার কৌশল
যখন অভিযোগ সামনে আসে, একই অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দেন যে ভোটের আগে বিজেপিতে যোগ দিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁর বক্তব্য, বিজেপির লক্ষ্য এখন ভোটের হার বৃদ্ধি করা এবং পশ্চিমবঙ্গে তাদের আগের অর্জন ৩৯ শতাংশ ভোটকে বাড়িয়ে ৫১ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।
সেদিন তিনজন নতুন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। প্রথমজন সহকারী অধ্যাপক অজয় কুমার দাস, যিনি এর আগে ISF-এর প্রার্থী ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক সঞ্জীব হাঁসদা—যিনি দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী সমাজ নিয়ে কাজ করছেন। আর তৃতীয়জন প্রাক্তন পুলিশ অফিসার বঙ্কিম বিশ্বাস, যিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে রাজনৈতিক পথে নামলেন। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, শিক্ষিত শ্রেণির অংশগ্রহণ দলকে আরও বিস্তৃত সমাজভিত্তিতে পৌঁছনোর সুযোগ করে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যোগদান উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের আদিবাসী এবং গ্রামীণ ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্র থেকে আসা মুখ দলকে নতুন পরিধিতে প্রবেশের প্রতীক। বিজেপির অভ্যন্তরীণ প্রচারেও এই বার্তা গুরুত্ব পাচ্ছে যে দল এখন রাজ্যের নানা অঞ্চল থেকে সমর্থন সংগ্রহ করছে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা
শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ সামনে আসার কিছু সময় আগে, উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে একটি প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রশাসন ও পুলিশকে জনগণের সমস্যা সমাধানে আরও “প্রো-অ্যাক্টিভ” হতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনকে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে হবে, সরকারি প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে হবে এবং স্থানীয় স্তরে মানুষের অভিযোগ শোনার প্ল্যাটফর্ম আরও শক্তিশালী করা হবে। তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য হলো উন্নয়নমূলক প্রকল্প সঠিকভাবে মানুষ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া এবং সেই কাজের বার্তা মানুষের সামনে তুলে ধরা।
তিনি অভিযোগ তোলেন, বিরোধীরা রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে “ভুল তথ্য প্রচার” করছে, যার জবাব প্রশাসনের স্বচ্ছ কাজই দিতে পারে। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়নি, বরং লক্ষ্যভিত্তিকভাবে এগোচ্ছে।
বিরোধী অভিযোগ ও সরকারি অবস্থান—দুই দৃষ্টিকোণ
অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিবেশ এখন বিভক্ত দুই মতাদর্শে। একদিকে বিরোধী পক্ষ বলছে, কাজ বাস্তবে পিছিয়ে পড়ে শুধুমাত্র প্রচারের আয়োজন করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, কাজ চলছে এবং প্রচার সেই প্রকল্পের তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি।
এখানে বাস্তবতা কোন দিকে, তা নির্ভর করছে প্রকল্পের কাজ কতটা মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান এবং কতটা সময়ের মধ্যে তা শেষ হবে তার ওপর। রাজনীতিতে প্রকল্পের ঘোষণা এবং প্রচার সাধারণ বিষয় হলেও, ভোটের আগে তার প্রভাব নিয়ে বিতর্ক হওয়া খুব স্বাভাবিক। ফলে এই বিতর্ককে নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণ
পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি বহুদিন ধরেই সংঘর্ষ, বিতর্ক এবং তীব্র প্রতিযোগিতায় ঘেরা। ভোটের আগের মাসগুলোতে প্রচার, প্রকল্পের ঘোষণা, নতুন যোগদান এবং প্রশাসনিক নির্দেশ—সবকিছুই ভোটারদের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে।
বিরোধী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, এই নির্দেশের পিছনে লক্ষ্য হলো ভোটের মুখে জনগণের কাছে উন্নয়নকে ঘিরে একটি ইতিবাচক ভাবনা তৈরি করা। অন্যদিকে রাজ্যের শাসকদল মনে করছে, উন্নয়নমূলক কাজ চলমান এবং তার প্রচার স্বাভাবিক।

এই দুই মতের সংঘর্ষই আগামী নির্বাচনের মূল আখ্যান তৈরি করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের অঙ্কে সংখ্যার গুরুত্বই সবচেয়ে বড়। শুভেন্দু অধিকারী যে ৩৯ শতাংশকে ৫১ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বললেন, সেখানে প্রতিটি শ্রমিক, নারী, ছাত্র, চাকরি প্রার্থী বা সাধারণ ভোটারের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষকথা
রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন দুটি প্রশ্ন—প্রকল্প বাস্তবায়ন কোথায় দাঁড়িয়ে এবং প্রচারের উদ্দেশ্য কতটা স্বচ্ছ। শুভেন্দুর অভিযোগ ভোটের আগে প্রশাসনের কাজের ধরন নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে। আর মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রশাসনের দায়িত্বের ওপর জোর দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে উন্নয়ন একটি বড় ইস্যু। কিন্তু উন্নয়ন ও প্রচারের সীমরেখা কোথায়—পথে কীভাবে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়—এটাই এখন মূল আলোচ্য। জনগণ ভোটের সময় সিদ্ধান্ত নেবে কোন বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো—প্রকল্পের ঘোষণা, নাকি বাস্তব অভিজ্ঞতা।
Source & Reference:
এই প্রতিবেদনের তথ্য Kolkata-তে আয়োজন করা বিরোধী দলের সংবাদ সম্মেলন, রাজ্য প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য এবং প্রকাশ্যে পাওয়া নিউজ রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রস্তুত। বিষয়টি সম্পর্কে মূল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে TV9 Bangla-র রাজনৈতিক বিভাগ এবং Anandabazar Patrika-র উত্তরবঙ্গ প্রশাসনিক বৈঠক সংক্রান্ত রিপোর্ট থেকে।