কলকাতা শহরের যানজট বছরের পর বছর ধরে এক গভীর সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অফিস সময় তো বটেই, সাধারণ দিনেও শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোয় আটকে থাকতে হয় অসংখ্য মানুষকে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি যে সংবাদ সামনে এসেছে—কলকাতার বিভিন্ন অংশে একাধিক নতুন রাস্তা তৈরির সবুজ সঙ্কেত মিলেছে—তা নিঃসন্দেহে শহরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই রাস্তা কি সত্যিই যানজট কমাতে পারবে? নাকি আগের মতোই কিছু দিন পর আবার সেই একই ভিড়, একই হতাশা ফিরে আসবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের বিশ্লেষণ।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাস্তা সম্প্রসারণ ও নতুন রাস্তা তৈরির অনুমোদন দিয়েছে। শহরের বিভিন্ন ওয়্যার্ডে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে—জনসংখ্যা, যানবাহনের চাপ এবং হঠাৎ বাড়তে থাকা অ্যাপ-ভিত্তিক গাড়ির সংখ্যার কারণে শহরের পুরনো রাস্তাঘাট আর প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। সেই কারণেই যেখানে যেখানে জায়গা পাওয়া গেছে কিংবা সংযোগ রাস্তায় উন্নতির সুযোগ ছিল, সেখানে নতুন প্রকল্পের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
বর্তমান উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পূর্ব কলকাতার বেলেঘাটা থেকে শিয়ালদহ অংশ পর্যন্ত ক্যানাল সাউথ রোড সম্প্রসারণ। এই রাস্তাটি বহু বছর ধরেই অতিরিক্ত চাপের মুখে ছিল, বিশেষ করে অফিস টাইমে এই রুটে গতি প্রায় শূন্যে নেমে আসে। রাস্তা যেহেতু ক্যানালের ধারে এবং খুবই সংকীর্ণ, তাই বিস্তারের প্রয়োজন ছিল বহুদিনের। অনুমোদন মিলেছে প্রায় ৫০ ফুট পর্যন্ত অংশকে বাড়ানোর, যা বাস্তবায়িত হলে শিয়ালদহ-চিংড়িঘাটা করিডরের উপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
দক্ষিণ কলকাতার পণ্ডিতিয়া রোডেও একই পরিস্থিতি। এলাকার বাই লেনগুলো সংকীর্ণ হওয়ায় নিয়মিত যানজট লেগেই থাকত। পুরসভা সেখানে ৩০ ফুট পর্যন্ত রাস্তা চওড়া করার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি মিলন্মেলা প্রাঙ্গণের পশ্চিম পাশ দিয়ে একটি নতুন সংযোগ রাস্তা তৈরি হলে সায়েন্স সিটি থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত একটি ছোট রিং রোড কার্যত তৈরি হয়ে যাবে। এর ফলে গোটা সংযোগ ব্যবস্থাই অনেকটা সাবলীল হতে পারে।
চকগড়িয়া এলাকায় নতুন হাসপাতাল সংলগ্ন অংশ থেকে আবাসিক কমপ্লেক্সের দিকে প্রায় আধ কিলোমিটার রাস্তাও নির্মাণ হতে চলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার দ্রুত বর্ধনশীল এলাকায় এটি একটি প্রয়োজনীয় সংযোগ হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি স্থানীয় যানবাহনের চাপ কমানোর পাশাপাশি আমবাগান থেকে EM Bypass–এ আসার পথকে আরও সহজ করে তুলতে পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়। শহরের নানা অংশে আরও কিছু ছোট-বড় অ্যাক্সেস রোডের পরিকল্পনা চলছে। যেসব জায়গায় রাস্তাঘাটের উপর হঠাৎ চাপ তৈরি হয়েছে বা নতুন বহুতল নির্মাণের ফলে জনবাসন-ঘনত্ব বেড়েছে—সেসব অংশেও নতুন সংযোগ রোডের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শহরে যেহেতু জমির অভাব প্রকট, তাই যেকোনো নতুন রোড-প্রকল্পই অত্যন্ত জটিল। তবুও পুরসভা সম্ভাব্য জায়গাগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে।

এবার প্রশ্ন আসে—এই উদ্যোগগুলো কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে শহরকে যানজটমুক্ত করতে পারবে? বিশ্বের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা বলে, নতুন রাস্তা নির্মাণের ফলে প্রথমদিকে যানজট কিছুটা কমলেও কয়েক বছর পর সেটা আবার বাড়তে থাকে। একে বলা হয় “Induced Demand”—রাস্তা বাড়লে গাড়িও বাড়ে। কলকাতার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠছে। কারণ শহরে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যাপ-ক্যাব, বাইক-ট্যাক্সি, ডেলিভারি-ভ্যান—এসব মিলিয়ে রাস্তায় গাড়ির ঘনত্ব প্রতিদিনই বাড়ছে।
তাই শুধু রাস্তা বাড়ালেই সমস্যা পুরোপুরি মিটবে না। প্রয়োজন আরও কিছু পরিকাঠামোগত বদল। যেমন—স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা, ফুটপাথ সংস্কার, নির্দিষ্ট পয়েন্টে পিক-আপ ও ড্রপ-অফ জোন, ট্রাফিক সিগন্যাল অপ্টিমাইজেশন, ওয়ানওয়ে প্ল্যানিং, সাইকেল-ট্র্যাক, বাস-লেন, মেট্রো রেল সংযোগ—এই সবকিছুকে একসাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। কলকাতা মেট্রো সম্প্রসারণের মতো প্রকল্প এগোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা সময়মতো শেষ না হলে রাস্তায় চাপ কখনোই কমবে না।
এক্ষেত্রে পুরসভার কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই মন্তব্য করেছেন, রাস্তা তৈরি বা সম্প্রসারণ একমাত্র সমাধান নয়, এটি বৃহত্তর নগরপরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র। তবে যেখানে সুযোগ আছে, সেখানে রাস্তা বাড়াতেই হবে, কারণ অনেক এলাকাতে রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ যে সেখানে নিয়মিত হর্ন, জ্যাম, বাস-চাপ সব মিলিয়ে মানুষ হাঁফিয়ে উঠেছেন।
তবে নতুন রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে। জমি-অধিগ্রহণ, রাস্তার ধারে থাকা পুরনো বাড়ি বা দোকান স্থানান্তর, অনুমোদনের জটিলতা, পরিবেশগত বাধা—সবকিছু মিলিয়ে কাজ সময়সাপেক্ষ হয়ে যায়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এসব প্রকল্প যদি দেরি হয়, তাহলে কাজ চলাকালীন সময়েও যানজট আরও বাড়বে। কখনো কখনো দেখা যায়, একটি অঞ্চল উন্নতির আগে আরও ভোগান্তির মধ্যে পড়ে।
নতুন রাস্তা তৈরির ফলে আবাসন ও রিয়েল এস্টেট বাড়তে পারে—এটিও একটি বড় সম্ভাবনা। কারণ কলকাতার নতুন উন্নত রোড-করিডোরগুলো সাধারণত এলাকাকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এতে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন আবাসন প্রকল্প আসে, অফিস-স্পেস তৈরি হয়। তবে এরও একটি নেতিবাচক দিক আছে—আবার জনঘনত্ব বাড়ে, ফলে কয়েক বছর পর একই রাস্তা আবার জ্যামে ভরে যায়। নগর পরিকল্পনায় তাই সমন্বিত ট্র্যাফিক সিস্টেমই একমাত্র সমাধান।

পরবর্তী পাঁচ বছরে কলকাতার পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? সম্ভাবনা ও সতর্কতা দুই-ই রয়েছে। যদি সমস্ত রোড-প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় এবং তার সঙ্গে মেট্রো সম্প্রসারণ, ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণ, সিগন্যাল আধুনিকীকরণ-সহ সব উদ্যোগ সমানতালে চলে—তাহলে শহরের যানজট অনেকটাই হাতের মুঠোয় আসতে পারে। কিন্তু যদি গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, পাবলিক ট্রান্সপোর্টকে শক্তিশালী করা না হয়, বেপরোয়া পার্কিং বন্ধ না হয়—তাহলে রাস্তা যতই বাড়ুক, যানজট কখনোই শেষ হবে না।
এই কারণেই বলা যায়, নতুন রাস্তা তৈরি—খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি সমাধানের অর্ধেক। বাকি অর্ধেক নির্ভর করে শহরের সার্বিক পরিকল্পনার উপর।
কলকাতার বাসিন্দারা বহুদিন ধরে যে মুক্তির আশায় অপেক্ষা করছেন—কম যাতায়াত সময়, কম জ্যাম, আরও স্বস্তিদায়ক শহর—নতুন প্রকল্পগুলো সেই দিকেই প্রথম পদক্ষেপ। তবে শেষ সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত, কতটা কার্যকর এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয় তার উপর।
নতুন রাস্তা তৈরির সবুজ সঙ্কেত নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু সেই খবরকে ‘স্থায়ী স্বস্তি’তে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন আরও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি, মিলিত প্রচেষ্টা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত। এক কথায়—এটি কলকাতার ভবিষ্যৎ নগরপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যার সফলতা শহরের আগামী প্রজন্মের জীবনকে বদলে দিতে পারে।
You Can Also Check:
https://newsprimetimes.com/
Source & Reference:
Hindustan Times Bangla – কলকাতার যানজট কমাতে উদ্যোগ, শহরজুড়ে একাধিক নতুন রাস্তা তৈরির সবুজ সঙ্কেত
https://www.hindustantimes.com/bangla/bengal/to-reduce-traffic-construction-of-multiple-new-roads-across-the-city-in-kolkata-271763205897134.html