ঝোরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছেন। ভারতের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক, সমাজসেবার দৃষ্টিভঙ্গি এবং বহুসাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তাঁকে আজ নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা করে তুলেছে।
ঝোরান মামদানি—এক নতুন ইতিহাসের সূচনা
২০২৫ সালে নিউ ইয়র্ক সিটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, যখন ঝোরান মামদানি (Zohran Mamdani) নির্বাচিত হলেন শহরের প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হিসেবে। তাঁর এই সাফল্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বরং ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের চিত্র আরও উজ্জ্বল হয়েছে, যেখানে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রগতিশীল নেতা এত বড় দায়িত্বে নির্বাচিত হলেন।
ভারতের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র
ঝোরান মামদানির জন্ম উগান্ডায়, তবে তাঁর পরিবারের মূল শিকড় ভারতবর্ষে। তাঁর মা মিনাল হাজরা একজন ভারতীয় সমাজকর্মী ও কবি, আর বাবা মামদানি একজন উগান্ডার অর্থনীতিবিদ। ঝোরান নিউ ইয়র্কে বড় হলেও তিনি সবসময় নিজের ভারতীয় সংস্কৃতি ও দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
তিনি প্রায়ই উল্লেখ করেছেন, তাঁর জীবনের সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা এসেছে ভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে। এ কারণেই তিনি নিউ ইয়র্কের অভিবাসী ও নিম্নআয়ের মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করেছেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও সংগ্রাম
ঝোরান মামদানি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন ২০২০ সালে, যখন তিনি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর কর্মজীবনের শুরুটা ছিল গ্রাসরুট পর্যায়ে — তিনি বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ন্যায্য প্রাপ্যতার জন্য আন্দোলন চালিয়েছেন।
তিনি ছিলেন “Democratic Socialists of America”-র সদস্য, এবং তাঁর নীতি ছিল “People Over Profit” — অর্থাৎ জনগণের স্বার্থকে সবকিছুর উপরে রাখা। তাঁর এই অবস্থান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিরাট সমর্থন এনে দেয়।

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়
২০২৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ঝোরান মামদানি বড় ব্যবধানে জয় লাভ করেন। তাঁর প্রচারাভিযানে মূল ফোকাস ছিল —
- Affordable Housing
- Healthcare for All
- Climate Justice
- Equality and Inclusion
এই নীতিগুলো শহরের মধ্যবিত্ত, অভিবাসী ও তরুণ ভোটারদের মন জয় করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঝোরানের জয় শুধুমাত্র এক রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং নিউ ইয়র্কের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীক।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার শুভেচ্ছা ও বলিউডের প্রতিক্রিয়া
নিউ ইয়র্কে বসবাসরত অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝোরান মামদানিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন,
“History has been made! Congratulations to New York City’s first Muslim South Asian mayor, Zohran Mamdani. A proud moment for our community.”
এই শুভেচ্ছা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। বলিউডের অনেক তারকাই ঝোরানের সাফল্যকে “নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা” বলে উল্লেখ করেন।
এমনকি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও ব্যাপকভাবে এই খবর প্রকাশ করেছে — কারণ এক সময় যে দেশ অভিবাসনের সূচনা করেছিল, আজ সেই দেশের এক বংশধর বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শহরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছে রোল মডেল
ঝোরান মামদানি আজ দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের কাছে এক রোল মডেল। তিনি প্রমাণ করেছেন যে বর্ণ, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় সাফল্যের পথে বাধা নয় — বরং বৈচিত্র্যই শক্তি।
ভারতের অনেক তরুণ নেতা এখন তাঁর কাজের ধরন ও নীতির দিকে নজর রাখছেন। বিশেষ করে তাঁর “inclusive governance” মডেল, যেখানে তিনি স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেন, সেটি প্রশংসিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ঝোরানের নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারাও তাঁকে “A symbol of global unity” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্বজুড়ে মিডিয়া হেডলাইন করেছে —
“From Queens to City Hall: Zohran Mamdani makes history in New York politics.”
এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে অভিবাসী ও মুসলিম পরিচয় নিয়ে রাজনীতি উত্তপ্ত, তখন এই জয় মানবতার এক নতুন বার্তা বহন করছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিউ ইয়র্কের ভারতীয় কনস্যুলেট অফিস থেকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানো হয়েছে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে —
“Zohran Mamdani’s leadership represents the shared democratic values of India and the United States.”
ভারতের মিডিয়াতেও ঝোরান মামদানিকে “গর্বের ভারতীয়” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তাঁর নেতৃত্বের দর্শন
ঝোরান মামদানি বলেছেন,
“আমি চাই নিউ ইয়র্ক এমন এক শহর হোক যেখানে সবাই নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে।”
তিনি তাঁর কাজের মূলে রেখেছেন মানবিকতা ও সমতার ধারণা। তাঁর নীতিগুলো স্পষ্টভাবে সামাজিক ন্যায়, পরিবেশ রক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের দিকে ইঙ্গিত করে।
কেন এই ঘটনা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঝোরান মামদানির এই সাফল্য ভারতের তরুণ সমাজে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এটি দেখায় যে ভারতীয় প্রবাসীরা এখন শুধুমাত্র ব্যবসা বা প্রযুক্তিতে নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বেও বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলছেন।
এটি ভারতের soft power diplomacy-এরও এক উদাহরণ, যেখানে সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হয়েছে।
দক্ষিণ এশীয় নারী ও সংখ্যালঘু রাজনীতির নতুন যুগ
ঝোরানের নির্বাচনের পর নিউ ইয়র্কে দক্ষিণ এশীয় নারীরাও নতুন করে রাজনীতিতে আগ্রহী হচ্ছেন। “Representation Matters” আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অনেক তরুণ নেত্রী তাঁর অনুপ্রেরণায় রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন।
এই প্রভাব শুধুমাত্র আমেরিকাতেই নয় — দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই বা ঢাকাতেও নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

উপসংহার
ঝোরান মামদানির জয় এক ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়, এটি এক প্রজন্মের পরিবর্তনের প্রতীক।
নিউ ইয়র্ক এখন এমন এক শহর, যেখানে একজন মুসলিম দক্ষিণ এশীয় তরুণ নেতৃত্বের আসনে বসেছেন, এবং সেখান থেকে মানবতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের বার্তা দিচ্ছেন।
তাঁর এই ঐতিহাসিক উত্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় —
“Leadership has no religion or color — only courage and compassion.”
You Can Also Check:
- India’s Rising Global Influence – newsprimetimes.com
- Top Stories on South Asian Leadership – newsprimetimes.com
- Global News and Politics – newsprimetimes.com
Sources & References:
- Hindustan Times – “Priyanka Chopra congratulates New York’s first Muslim South Asian mayor Zohran Mamdani”
- BBC News – “Zohran Mamdani creates history in New York mayoral election”
- The Guardian – “South Asian roots and New York dreams: Zohran Mamdani’s journey”
- The New York Times – “From Immigrant Activist to Mayor: The rise of Zohran Mamdani”
- NDTV World – “Indian-origin Zohran Mamdani becomes NYC’s first Muslim mayor”