সজনেখালি থেকে কালাশ দ্বীপ – সুন্দরবনের সেরা দর্শনীয় স্থান কোনগুলি?

Spread the love

সূর্যাস্তের সময় কালাশ দ্বীপে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির রঙের খেলা দেখা যায়, যা যে কোনো ভ্রমণকারীর মনে গেঁথে যায় চিরকালের মতো।

পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন শুধু ভারতের গর্ব নয়, বিশ্বের কাছে এক অদ্ভুত বিস্ময়। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এই জটিল ভূখণ্ড প্রকৃতি, প্রাণীজগৎ ও নদীমাতৃক পরিবেশের অসাধারণ সমন্বয়ে গঠিত। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজত্ব, গঙ্গার অসংখ্য শাখা-উপশাখা, খাঁড়ি ও দ্বীপের মিলনে এই সুন্দরবন আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। যারা প্রকৃতিপ্রেমী বা ভ্রমণপিপাসু, তাঁদের কাছে সুন্দরবন এক অপূর্ব গন্তব্য। এখানে ভ্রমণের সময়ে কিছু জায়গা একেবারেই মিস করা উচিত নয়।

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় সজনেখালি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কথা। সুন্দরবনের গভীরে এই অংশ পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। এখানে একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে, যেখান থেকে গহীন জঙ্গলের অসাধারণ দৃশ্য ধরা দেয় চোখে। ভাগ্য সহায় হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও দেখা মেলে। এছাড়া হরিণ, বানর, কুমির, নানা প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীও এখানে অবাধে বিচরণ করে। সজনেখালি সুন্দরবন সফরের অন্যতম কেন্দ্র।

এরপর আসা যাক কালাশ দ্বীপে। এই দ্বীপটি গঙ্গার মোহনায় অবস্থিত এবং বালুকাবেলার সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি এক স্বর্গরাজ্য। শীতকালে এখানে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি আশ্রয় নেয়, যা দ্বীপকে আরও মনোরম করে তোলে। সূর্যাস্তের সময় কালাশ দ্বীপে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির রঙের খেলা দেখা যায়, যা যে কোনো ভ্রমণকারীর মনে গেঁথে যায় চিরকালের মতো।

সুন্দরবনের আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো দুবলাটি। একে বলা হয় “ফিশারম্যানস ভিলেজ”। এখানে অসংখ্য মৎস্যজীবী পরিবার বসবাস করে। পর্যটকেরা চাইলে তাঁদের জীবনযাত্রা, মাছ ধরার পদ্ধতি, নৌকায় ভেসে থাকা দিনের সংগ্রাম কাছ থেকে দেখতে পারেন। দুবলাটির সমুদ্রতটও ভ্রমণকারীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। এই জায়গাটি সুন্দরবনের স্বতন্ত্র গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সামনে আনে।

গোসাবা গ্রামও সুন্দরবন ভ্রমণে গুরুত্বপূর্ণ। একে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার বলা হয়। এখানে একসময় ব্রিটিশ সমাজসংস্কারক স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন বসবাস করেছিলেন। তাঁর তৈরি করা “হ্যামিলটন বাংলো” আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি আছে গান্ধী মেমোরিয়াল। গোসাবা থেকে সুন্দরবনের গভীরে নৌকাভ্রমণ শুরু হয়, তাই পর্যটকদের জন্য এটি এক অপরিহার্য স্থান।

হরিণ দেখার জন্য বিশেষ জায়গার মধ্যে দুমদুমিয়া আর পীরখালি উল্লেখযোগ্য। এ জায়গাগুলোতে প্রচুর চিত্রা হরিণ অবাধে ঘুরে বেড়ায়। পর্যটকেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে একসাথে দল বেঁধে হরিণ দেখতে পেলে অন্যরকম আনন্দ পান। বনের নিস্তব্ধতার মাঝে হরিণের চলাফেরা এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে।

সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ লোথিয়ান দ্বীপ। একে বলা হয় পাখির দ্বীপ। শীতকালে এখানে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি ভিড় জমায়। আকাশ ভরে ওঠে রঙিন পাখির ডানার ঝলকে। পাখিপ্রেমীদের জন্য এটি এক অপূর্ব জায়গা, যেখানে তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে পারেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে।

সুন্দরবনের ভ্রমণ মানেই শুধু বন্যপ্রাণী দেখা নয়, বরং প্রকৃতির অদ্ভুত বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচয়। এখানে গঙ্গার স্রোত, নদীর জোয়ার-ভাটা, কাদামাটির দ্বীপ আর ম্যানগ্রোভ গাছের অরণ্য এক অন্য রকম পরিবেশ তৈরি করে। প্রতিটি ভ্রমণকারীর কাছে সুন্দরবন এক অমূল্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সুন্দরবন ভ্রমণ মানে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে এক গভীর পরিচয়। সজনেখালি থেকে কালাশ দ্বীপ, দুবলাটি থেকে গোসাবা, হরিণ পর্যবেক্ষণ থেকে লোথিয়ান দ্বীপ—প্রতিটি জায়গা নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে। যারা প্রকৃতির বুকে কিছুটা সময় কাটাতে চান, তাঁদের জীবনে একবার হলেও সুন্দরবন ঘুরে আসা উচিত।

সুন্দরবনের আরেকটি জনপ্রিয় স্থান হলো বাগনান ও হরিঞ্চরা অঞ্চল। এখানে নৌকাভ্রমণের সময় প্রকৃতির অন্য রকম রূপ চোখে পড়ে। নদীর দুই তীরে ম্যানগ্রোভ গাছের ঘন সবুজ ছায়া, মাঝে মাঝে নদীর জলে ভেসে ওঠা কুমির বা ডলফিন ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। হরিঞ্চরার আশেপাশে নানা ছোট দ্বীপ রয়েছে, যেখানে পাখি ও হরিণ দেখা যায়। যারা প্রকৃতির নীরবতা উপভোগ করতে চান, তাঁদের জন্য এই জায়গাগুলো বিশেষ উপযুক্ত।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় সংস্কৃতিও। এখানে বসবাসকারী মানুষরা বহু প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করেন। নদীর ভাঙন, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও তাঁদের গান, নাচ, লোকসংস্কৃতি সুন্দরবনের পরিবেশকে আলাদা রঙে রাঙিয়ে তোলে। পর্যটকেরা চাইলে স্থানীয় গ্রামে রাত কাটিয়ে এই সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হতে পারেন।

সুন্দরবনের ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে রাতের নৌভ্রমণ। জোৎস্নারাতে নদীর জলে আলো-ছায়ার খেলা, চারপাশের নিস্তব্ধতা আর দূরে ম্যানগ্রোভ বনের অন্ধকার রহস্যময় পরিবেশ মনে অদ্ভুত শিহরণ জাগায়। অনেক ভ্রমণকারী মনে করেন, রাতের সুন্দরবন প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় রূপ প্রকাশ করে।

সুতরাং, সুন্দরবন শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি এক শিক্ষার জায়গা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, মানুষ কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়ে টিকে থাকে, আর জীববৈচিত্র্যকে কিভাবে রক্ষা করা যায়—এসব বিষয় সুন্দরবন আমাদের শেখায়। তাই একবার সুন্দরবনে গেলে শুধু নয়নাভিরাম দৃশ্যই নয়, জীবনের গভীর এক শিক্ষা নিয়েও ফেরা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *