দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই কীভাবে নাট-বল্টু ছাড়াই জন্ম নিল হাওড়া ব্রিজ? জানুন সেই অজানা ইতিহাস

Spread the love

সেই সময় প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘ক্যান্টিলিভার ব্রিজ’ বা ঝুলন্ত সেতুর নকশা জনপ্রিয় ছিল। অবশেষে ১৯৩৫ সালে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

হাওড়া ব্রিজ – কলকাতার গৌরব, বাংলার ইতিহাসের এক অমর স্থাপত্য। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে এই ব্রিজ দিয়ে, অথচ এর অজানা ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কলকাতা শহর দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠছিল। তখন গঙ্গা নদীর দুই তীরের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা বা ফেরিঘাট। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে তখন ভীষণ সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। ফলে একটি স্থায়ী সেতুর পরিকল্পনা উঠে আসে ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে। ১৮৬২ সালে প্রথমবার হাওড়া ও কলকাতার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। তবে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে অনেকটা সময় লেগে যায়।

১৯০৬ সালে আবারও প্রস্তাব আনা হয় একটি আধুনিক সেতু নির্মাণের। সেই সময় প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘ক্যান্টিলিভার ব্রিজ’ বা ঝুলন্ত সেতুর নকশা জনপ্রিয় ছিল। অবশেষে ১৯৩৫ সালে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ব্রিটিশ কোম্পানি ব্রাজার্স রচেস্টার এই নির্মাণের দায়িত্ব নেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সেতু নির্মাণে একটিও নাট-বল্টু ব্যবহার করা হয়নি, পুরো সেতুটি নির্মাণ হয়েছে বিশাল স্টিল প্লেটগুলোকে রিভেটিং বা গরম ছিদ্র করে জোড়া লাগানোর মাধ্যমে।

হাওড়া ব্রিজ নির্মাণে প্রায় ২৬,৫০০ টন স্টিল ব্যবহার করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই এসেছিল ব্রিটিশ কোম্পানি ‘টাটার স্টিল’ থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধাতুর ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এই প্রকল্প চলতে থাকে, কারণ কলকাতাকে ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী ধরে রাখা জরুরি ছিল। ১৯৪২ সালে এই সেতু সম্পূর্ণ হয়, এবং ১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এটি খুলে দেওয়া হয়।

প্রথমদিকে এর নাম ছিল “নিউ হাওড়া ব্রিজ”। পরে ১৯৬৫ সালে এটি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে নামকরণ করা হয় “রবীন্দ্র সেতু”। কিন্তু আজও মানুষ স্নেহের সঙ্গে একে “হাওড়া ব্রিজ” নামেই ডাকে। এই সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ২১৫০ ফুট, প্রস্থ ৭১ ফুট, এবং এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ক্যান্টিলিভার সেতু হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষাধিক যানবাহন ও অসংখ্য পথচারী এই ব্রিজ ব্যবহার করেন।

হাওড়া ব্রিজ শুধু এক টুকরো ইস্পাত নয়, এটি কলকাতার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বাংলা সিনেমা থেকে সাহিত্য – অসংখ্য জায়গায় এই সেতুর উল্লেখ পাওয়া যায়।

হাওড়া ব্রিজের ইতিহাসে আরও কিছু বিস্ময়কর দিক রয়েছে যা অনেকেই জানেন না। সেতুটি তৈরি করার সময় নদীর তলায় বিশাল পিলার বসানোর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। গঙ্গার প্রবল স্রোত, জলস্তরের গভীরতা আর নদীর পলির কারণে ভিত্তি তৈরি করা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। ইঞ্জিনিয়াররা বিশেষভাবে কংক্রিট ও স্টিলের মিশ্রণ ব্যবহার করে এই কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। এর ফলে সেতুটি আজও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও এর নিচ দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য নৌকা ও জাহাজ চলাচল করে।

নির্মাণকালে শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিক দিন-রাত পরিশ্রম করে সেতুটি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের কাজের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল প্রবল। গরম স্টিল প্লেট জোড়া লাগানো, নদীর তলায় পিলার বসানো, এবং বিশালাকার স্টিলের কাঠামো ঝুলিয়ে রাখা—সবকিছুই ছিল প্রাণঘাতী ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তবু সেই শ্রমিকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সেতু আজ সম্ভব হতো না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাওড়া ব্রিজের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। জাপানি বিমান হামলার ভয় ছিল কলকাতায়, কারণ এটি তখন ব্রিটিশ ভারতের সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। শোনা যায়, হাওড়া ব্রিজও সেই সময় হামলার টার্গেট ছিল। তবে সৌভাগ্যবশত, ব্রিজটি কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। বরং যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই এর উদ্বোধন ঘটে, এবং এটি কলকাতার প্রাণরেখা হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত হাওড়া ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ একটি বড় দায়িত্ব। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট (বর্তমানে সাইগনেট সত্তা) এই ব্রিজের দেখাশোনা করে থাকে। প্রতিদিনের যানজট, যানবাহনের চাপ, এবং দূষণের প্রভাবে সেতুর ইস্পাত কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এজন্য নিয়মিতভাবে এর রঙ করা হয়, বিশেষ অ্যান্টি-করোশান কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, এবং খুঁটিনাটি জায়গায় মেরামত চালানো হয়।

আজ হাওড়া ব্রিজ শুধু একটি সেতু নয়, কলকাতার এক অনন্য প্রতীক। অসংখ্য সিনেমার দৃশ্যে, আলোকচিত্রে, কিংবা ভ্রমণপিপাসু মানুষের স্মৃতিতে এই সেতু চিরকাল বেঁচে থাকবে। সূর্যোদয়ের সময়ে কিংবা রাতের আলোয় সেজে ওঠা হাওড়া ব্রিজের সৌন্দর্য আজও হাজারো দর্শককে মুগ্ধ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *