শোনা যায়, প্রথম রকেট ‘Nike-Apache’ মহাকাশ গবেষণার জন্য কেরালার তিরুবনন্তপুরমের কাছে থুম্বা গ্রামে আনা হয়েছিল একটি সাইকেলের পেছনে বেঁধে।
ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা বা ISRO আজ বিশ্বে অন্যতম সেরা মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। চাঁদে পা রাখা থেকে শুরু করে মঙ্গল গ্রহে স্যাটেলাইট পৌঁছে দেওয়া— সবই সম্ভব করেছে ভারতের বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনেক সংগ্রাম, অদম্য প্রচেষ্টা এবং ত্যাগের ইতিহাস, যা অনেকেই জানেন না। ISRO-র অজানা কাহিনিগুলো আসলে ভারতীয় বিজ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
ভারতের মহাকাশ গবেষণার যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারেই সীমিত বাজেট ও সীমিত প্রযুক্তির মধ্যে। ১৯৬০-এর দশকে যখন আমেরিকা ও রাশিয়া মহাকাশে প্রাধান্য বিস্তার করছিল, তখন ভারতের অবস্থান ছিল একেবারেই প্রাথমিক স্তরে। তবুও ভারতের মহান বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই বিশ্বাস করতেন— মহাকাশ গবেষণা কেবল ধনী দেশগুলির জন্য নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলিরও সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৬২ সালে স্থাপিত হয় INCOSPAR (Indian National Committee for Space Research), যা পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে ISRO-তে রূপ নেয়।
প্রথম দিকে ISRO-র কাজ ছিল প্রায় অকল্পনীয় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এগোনো। শোনা যায়, প্রথম রকেট ‘Nike-Apache’ মহাকাশ গবেষণার জন্য কেরালার তিরুবনন্তপুরমের কাছে থুম্বা গ্রামে আনা হয়েছিল একটি সাইকেলের পেছনে বেঁধে। এমনকি সেই সময় যন্ত্রপাতি, স্যাটেলাইটের যন্ত্রাংশ ইত্যাদি বহন করতে ব্যবহার করা হতো গরুর গাড়িও। থুম্বার সেই সেন্ট মেরি মাগদালিন চার্চকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল প্রথম রকেট লঞ্চ কন্ট্রোল সেন্টারে। চার্চের পুরনো প্রার্থনাঘর হয়ে উঠেছিল অফিসরুম, আর পুরোহিতদের বাসস্থান হয়ে উঠেছিল ওয়ার্কশপ। এই ইতিহাস আজও ভারতের বিজ্ঞানী মহলের কাছে এক অনুপ্রেরণার কাহিনি।
১৯৭৫ সালে ভারত তার প্রথম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’ মহাকাশে পাঠায়। তবে সেটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল রাশিয়ার সাহায্যে। সেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে ISRO নিজস্ব ক্ষমতায় মহাকাশ প্রযুক্তিতে এগোতে থাকে। ১৯৮০ সালে ভারতের ‘রোহিনী’ স্যাটেলাইট সফলভাবে নিজস্ব SLV-3 রকেটের মাধ্যমে কক্ষপথে পৌঁছায়। সেই মুহূর্তটিই ছিল ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
তবে ISRO-র অজানা ইতিহাসে যেমন সাফল্য আছে, তেমনি আছে ব্যর্থতার কাহিনি। অনেক উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল, অনেক সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্প আটকে গিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই বিজ্ঞানীরা নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছেন। ১৯৯০-এর দশকে আমেরিকা যখন ভারতকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে অস্বীকার করে, তখন ভারত নিজেদের প্রযুক্তি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলেই আজ PSLV, GSLV-এর মতো উৎক্ষেপণযান তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
ISRO-র সাফল্যের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর ‘কম খরচে মহাকাশ প্রযুক্তি’। নাসা বা ইউরোপিয়ান মহাকাশ সংস্থার তুলনায় বহু কম খরচে ISRO মহাকাশ মিশন সফল করেছে। যেমন মঙ্গলযান মিশন বা ‘Mars Orbiter Mission (MOM)’ মাত্র ৪৫০ কোটি টাকায় সফল হয়, যা একটি হলিউড ছবির বাজেটের চেয়েও কম। এই সাফল্য বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল।
ভারতের মহাকাশ গবেষণার অজানা দিকগুলির মধ্যে একটি হলো— ISRO-র বিজ্ঞানীদের অদম্য দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ। অনেক বিজ্ঞানীই পরিবার ছেড়ে, ব্যক্তিগত আরামের জীবন বিসর্জন দিয়ে দিনরাত গবেষণায় নিমগ্ন থেকেছেন। অনেক সময় তাঁরা অল্প বেতনে কাজ চালিয়ে গেছেন, কারণ তাঁদের কাছে দেশ ও বিজ্ঞানের উন্নতি সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল।
আজ ISRO শুধু মহাকাশ গবেষণা নয়, বরং ভারতের অর্থনীতি, যোগাযোগ, কৃষি, আবহাওয়া পূর্বাভাস, প্রতিরক্ষা এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে টেলিভিশন থেকে ইন্টারনেট, মোবাইল যোগাযোগ থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য— সবই সম্ভব হয়েছে।
ISRO-র ইতিহাস তাই কেবল একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের কাহিনি নয়, ভারতের আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা, সীমিত সম্পদ ও বিশ্বরাজনীতির চাপ সত্ত্বেও ভারত মহাকাশ গবেষণায় আজ এক শীর্ষস্থানে পৌঁছেছে। এই সাফল্যের পেছনে আছে ত্যাগ, বিশ্বাস, এবং এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি।