SCO সামিট কী? কেন আন্তর্জাতিক বিশ্বে এই সামিট এত গুরুত্বপূর্ণ?

Spread the love

এসসিও সামিটকে অনেকেই একটি বিকল্প কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে ন্যাটো বা জি৭-এর মতো কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে এসসিও এশিয়ার দেশগুলোকে এক মঞ্চে এনে নিজেদের সমস্যার সমাধান করার সুযোগ দিচ্ছে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা এসসিও (SCO) আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক মঞ্চ। ২০০১ সালে সাংহাই শহরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান ছিল এর সদস্য। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান যুক্ত হয় এবং ২০২৩ সালে ইরানও পূর্ণ সদস্যপদ পায়। বর্তমানে এই সংস্থাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের একটি বড় অংশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারিত হচ্ছে।

এসসিও সামিট মূলত সেই বার্ষিক বৈঠক যেখানে সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানরা একত্রিত হন। এখানে আলোচনা হয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি ও পরিবহন প্রকল্প, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বৈশ্বিক কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তান সংকট, মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা এবং পাকিস্তান-আফগান সীমান্তের অস্থিরতা এই সামিটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এই সামিটের একটি প্রধান দিক হলো ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব। বর্তমানে এসসিওর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বাস করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে। পশ্চিমা জোট যেমন ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জি৭ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে, তেমনই এসসিওকে অনেক বিশেষজ্ঞ চীন-রাশিয়া নেতৃত্বাধীন একটি পাল্টা জোট হিসেবে দেখেন। এই কারণে এটি আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এসসিও সামিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, উত্তর-দক্ষিণ ট্রানজিট করিডর, ভারত-মধ্য এশিয়া সংযোগ প্রকল্প—এসব বড় অবকাঠামো ও বাণিজ্য উদ্যোগ প্রায়শই এই সামিটে আলোচিত হয়। ফলে এই বৈঠক শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামো নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।

এসসিও সামিটের আরেকটি বড় দিক হলো কূটনৈতিক সংলাপ। ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়ার মতো দেশগুলো যাদের মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ দেখা যায়, তারা এক মঞ্চে বসে আলাপ-আলোচনার সুযোগ পায়। ফলে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি হয়। অনেক সময় সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে কিছু জটিল সমস্যার সমাধানের পথও বেরিয়ে আসে।

এসসিও সামিট কেবল একটি বার্ষিক বৈঠক নয়, এশিয়া-কেন্দ্রিক এক বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এটি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কৌশলগত সমীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারা অনেকটাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে তাই প্রতিটি এসসিও সামিট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকে সবসময় একটি বিশেষ গুরুত্ব পায় সন্ত্রাসবাদ বিরোধী পদক্ষেপ। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান ঘিরে উগ্রপন্থার যে হুমকি রয়েছে, তা মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসসিও সামিটে সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতার পথ খুঁজে বের করে। এর ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠছে, যা একক দেশগুলির পক্ষে সম্ভব নয়।

জ্বালানি খাতও এসসিও সামিটের আলোচনার একটি বড় অংশ। ইরান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের বিশাল ভাণ্ডারের উপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে চীন ও ভারত হলো জ্বালানির বৃহত্তম ভোক্তা। এই প্রেক্ষাপটে এসসিও সামিটে জ্বালানি করিডর, পাইপলাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগের প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্রেও এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দেয়া হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্র-শিক্ষক বিনিময়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পর্যটন উন্নয়ন ইত্যাদি এই সামিটের আলোচনার অংশ। এর ফলে শুধু সরকার স্তরে নয়, সাধারণ মানুষের স্তরেও একে অপরের প্রতি বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের সাংস্কৃতিক সংযোগ দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সহযোগিতাকে আরও টেকসই করে তোলে।

এসসিও সামিটকে অনেকেই একটি বিকল্প কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে ন্যাটো বা জি৭-এর মতো কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে এসসিও এশিয়ার দেশগুলোকে এক মঞ্চে এনে নিজেদের সমস্যার সমাধান করার সুযোগ দিচ্ছে। এই কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে এসসিও দেশগুলির সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। ফলে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে।

সুতরাং, এসসিও সামিট আন্তর্জাতিক রাজনীতির শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত সম্পর্কের দিকনির্দেশক। এটি এমন একটি মঞ্চ যেখানে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণের নানা স্বার্থ ও মতভেদ একত্রে এসে আলোচনা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এসসিও সামিট আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমেই বেশি প্রভাব বিস্তার করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *