কেন ‘গঙ্গা নদী’কে হিন্দুধর্মে পূজো করা হয়?

Spread the love

গঙ্গা নদীকে কেন পূজো করা হয়?

হিন্দুধর্মে গঙ্গা নদীকে পূজো করার পেছনে ধর্মীয়, পৌরাণিক, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক—চারটি স্তরের গভীর কারণ রয়েছে। এই নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক জলধারা নয়, বরং বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি দেবী ‘গঙ্গা’—যিনি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে মানবজাতিকে পাপমুক্তি ও মুক্তির পথ দেখিয়েছেন।

প্রথমত, পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, গঙ্গার উৎপত্তি ব্রহ্মার কমণ্ডলু থেকে। রাজা ভগীরথ কঠোর তপস্যা করে গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আনেন, যাতে তাঁর পূর্বপুরুষদের মুক্তি হয়। ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে গঙ্গা পৃথিবীতে নামতে রাজি হলেও, তাঁর প্রবল স্রোত পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারত। তাই ভগবান শিব তাঁর জটায় গঙ্গাকে ধারণ করে স্রোতকে শান্ত করে মাটিতে নামান। এই ঘটনাকে “গঙ্গা অবতরণ” বা “গঙ্গা দশহরা” উৎসব হিসেবে পালন করা হয়।

দ্বিতীয়ত, গঙ্গার জলকে পবিত্র ধরা হয়। হিন্দু বিশ্বাসে গঙ্গাজলে স্নান করলে পাপ ধুয়ে যায়, আর মৃত্যুর পর গঙ্গাজল পান বা দেহে ছোঁয়ালে আত্মা মুক্তি (মোক্ষ) লাভ করে। এই কারণে বারাণসী, হরিদ্বার, আলাহাবাদ (প্রয়াগরাজ)-এর মতো গঙ্গাতীরবর্তী শহরগুলি তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত।

তৃতীয়ত, গঙ্গা মা হিন্দু ধর্মে শুধু পবিত্রতার প্রতীক নন, তিনি জীবনের ধারক। গঙ্গা নদী কৃষি, পানীয় জল, নৌপরিবহন ও অসংখ্য জীবজন্তুর জন্য জীবনধারা। তাই হাজার বছরের সভ্যতা গঙ্গার তীরে বিকশিত হয়েছে। ফলে এই নদীর প্রতি মানুষের ভক্তি স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় রূপ নিয়েছে।

চতুর্থত, আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা অনুসারে, গঙ্গা হলেন ‘ভক্তি’ ও ‘জ্ঞান’-এর প্রবাহ। তাঁর অবিরাম ধারা মানুষের জীবনে অনন্ত চক্র, শুদ্ধি ও পুনর্জন্মের প্রতীক। তাই কবি, সাধক, গায়ক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই গঙ্গার মহিমা গান করেছেন।

গঙ্গা পূজোর মধ্য দিয়ে মানুষ শুধু একটি নদীকে নয়, প্রকৃতি ও জীবনের চক্রকেও শ্রদ্ধা জানায়। গঙ্গা এখানে দেবী, মা, মুক্তিদাত্রী ও জীবনদাত্রী—সব রূপেই পূজিত।

গঙ্গা নদীকে ঘিরে হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠানগুলিতে অসংখ্য প্রতীকী দিক রয়েছে। প্রতিদিন ভোরে গঙ্গাতীরে ‘গঙ্গা আরতি’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভক্তরা প্রদীপ, ধূপ এবং ফুল নিবেদন করেন। এই আরতিতে বিশ্বাস করা হয়, গঙ্গা মা নিজের অসীম কৃপায় ভক্তদের মনোবাসনা পূর্ণ করেন এবং তাদের পাপমোচন করেন। বিশেষ করে বারাণসী, হরিদ্বার এবং ঋষিকেশের গঙ্গা আরতি সারা বিশ্বের পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

শাস্ত্র অনুযায়ী, গঙ্গার জলকে ‘অমৃত’ বা অমরত্বদায়িনী বলা হয়। বৈজ্ঞানিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত গঙ্গাজলে পচন ধরা কঠিন, যা প্রাচীন মানুষদের কাছে অলৌকিক বলে মনে হত। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই গঙ্গাজল পূজার্চনা, জন্মসংক্রান্ত অনুষ্ঠান, বিবাহ এবং মৃত্যুকালীন আচার—সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

গঙ্গাকে ঘিরে হিন্দু পুরাণে আরও বহু কাহিনি আছে। যেমন মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে, গঙ্গা রাজা শান্তনুর স্ত্রী এবং ভীষ্মের জননী ছিলেন। তাঁর চরিত্রে মাতৃত্ব, ত্যাগ ও দৃঢ়তার অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। এই কারণে গঙ্গা কেবল প্রাকৃতিক স্রোত নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধেরও প্রতীক।

গঙ্গার অবতরণের দিন, অর্থাৎ গঙ্গা দশহরা, সারা ভারতজুড়ে ভক্তরা নদীতে স্নান করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে স্নান করলে দশ ধরনের পাপ নাশ হয়। উত্তর ভারত, বিশেষত উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক অঞ্চলে এই দিনটি অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। নদীর তীরে মেলা বসে, ভক্তরা দান-ধ্যান করেন এবং গঙ্গা মাকে প্রসন্ন করার জন্য নানা পূজা সম্পন্ন হয়।

তবে গঙ্গার প্রতি এই ভক্তি শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, বরং ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণেও গড়ে উঠেছে। হাজার বছর ধরে গঙ্গা নদী ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। গঙ্গার উর্বর অববাহিকা কৃষির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ, যার কারণে অর্থনীতি ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই এই নদীর ভূমিকা অপরিসীম। হিন্দু সমাজে তাই গঙ্গা শুধু দেবী নন, বরং সভ্যতার মাতা হিসেবেও পূজিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *