রাশিয়া কেন মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে আলাস্কাকে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল?

Spread the love

১৮৬৭ সালের ৩০ মার্চ রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যেখানে মাত্র ৭.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (আজকের দরে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার) আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়।

আলাস্কা আজকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গরাজ্য। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, একসময় এটি ছিল রাশিয়ার অধীনে। কীভাবে এত বিশাল এবং সম্পদসমৃদ্ধ একটি ভূমি আমেরিকার হাতে এল, তার পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস।

আলাস্কার ভূখণ্ডে রাশিয়ার উপস্থিতি শুরু হয়েছিল ১৮শ শতকে। রাশিয়ান অভিযাত্রী ভিটাস বেরিং ১৭৪১ সালে এই অঞ্চল আবিষ্কার করেন। শিকারযোগ্য প্রাণী, বিশেষ করে সমুদ্র ও স্থলচর্মী পশুর মূল্যবান লোমের কারণে রাশিয়ান ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে এখানে উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে। তবে এখানকার আবহাওয়া, দূরত্ব এবং রাশিয়ার কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্নতা তাদের জন্য ছিল এক বড় সমস্যা।

১৯শ শতকের মাঝামাঝি এসে রাশিয়ার হাতে আলাস্কা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়, অন্যদিকে আশঙ্কা বাড়তে থাকে যে ব্রিটিশরা কানাডার দিক থেকে যেকোনও সময় আলাস্কার দখল নিতে পারে। ফলে রাশিয়ার জন্য আলাস্কা রাখা আর লাভজনক মনে হচ্ছিল না।

এই সময় রাশিয়া আলাস্কা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের প্রস্তাবের প্রতি সবচেয়ে আগ্রহ দেখায় যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৬৭ সালের ৩০ মার্চ রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যেখানে মাত্র ৭.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (আজকের দরে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার) আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়। অর্থাৎ প্রতি একরের দাম পড়েছিল মাত্র দুই সেন্ট!

সেই সময় অনেক আমেরিকানই এই কেনাকাটাকে উপহাস করেছিলেন। তাঁরা একে বলতেন “সিওয়ার্ডস ফোলি” বা “সিওয়ার্ডের বোকামি”—কারণ এই চুক্তি করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ. সিওয়ার্ড। তাঁদের ধারণা ছিল, বরফে ঢাকা এই জনবসতিহীন ভূমি থেকে কোনও লাভ হবে না। কিন্তু সময় প্রমাণ করে দেয়, এটি ছিল আমেরিকার অন্যতম সেরা চুক্তি।

কারণ, আলাস্কা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার নয়, বরং সোনা, তেল, গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের জন্য আজ যুক্তরাষ্ট্রের এক অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এর ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করে তোলে।

একসময়ের রাশিয়ার দূরবর্তী উপনিবেশ আজ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতীক। বলা যায়, রাশিয়ার অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আমেরিকার দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলেই আলাস্কা আজ আমেরিকার মুকুটের অন্যতম রত্ন।

আলাস্কার বিক্রির চুক্তি হওয়ার পরপরই আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় ১৮৬৭ সালের ১৮ অক্টোবর। সেদিন আলাস্কার রাজধানী সিটকায় রাশিয়ান পতাকা নামিয়ে তার পরিবর্তে মার্কিন পতাকা উত্তোলন করা হয়। যদিও চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে, তবুও আলাস্কার রাশিয়ান বাসিন্দারা নতুন শাসন মেনে নিতে প্রথম দিকে দ্বিধায় ছিলেন। অনেকেই ধীরে ধীরে ফিরে যান রাশিয়ায়, আর যারা থেকে গিয়েছিলেন তারা নতুন পরিচয়ের সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হন।

প্রথমদিকে আলাস্কাকে যুক্তরাষ্ট্র তেমন গুরুত্ব দেয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে এটি এক প্রকার “অপ্রয়োজনীয় অঞ্চল” হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু ১৮৯৬ সালে ইউকন অঞ্চলে সোনার খনি আবিষ্কার হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। “ক্লনডাইক গোল্ড রাশ” নামে পরিচিত এই সময়ে হাজার হাজার অভিযাত্রী ও ব্যবসায়ী আলাস্কার দিকে ছুটে আসেন। অর্থনীতি জেগে ওঠে, বসতি গড়ে ওঠে, আর আলাস্কার ভবিষ্যৎ আমেরিকার কাছে ধীরে ধীরে মূল্যবান হয়ে ওঠে।

২০শ শতকে এসে আলাস্কার প্রকৃত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান ছিল এশিয়ার খুব কাছাকাছি। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নজরদারির জন্যও আলাস্কার ঘাঁটিগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যেটিকে একসময় “বরফে ঢাকা অচল ভূমি” বলা হয়েছিল, সেটিই কৌশলগত দিক থেকে আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী অঞ্চল হয়ে ওঠে।

আলাস্কা ১৯৫৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আজ আলাস্কা শুধু তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যই নয়, তার অনন্য সংস্কৃতি, স্থানীয় ইনুইট জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের জন্যও সারা বিশ্বে বিখ্যাত। ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, আলাস্কার রাশিয়া থেকে আমেরিকার হাতে চলে আসা শুধু দুটি দেশের মধ্যে একটি আর্থিক চুক্তি ছিল না, ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যার প্রভাব আজও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *