কেন বজরংবলীর গায়ে মঙ্গলবারে সিঁদুর লাগানো হয়?

Spread the love

মঙ্গলবার দিনটি নিজেই শক্তি ও সাহসের প্রতীক। জ্যোতিষশাস্ত্রে মঙ্গল গ্রহকে যোদ্ধাদের গ্রহ বলা হয়। এর রং লাল, যা শক্তি, রক্ত, প্রাণশক্তি ও অগ্নির প্রতীক। মঙ্গলবারে হনুমানের পূজা করার মাধ্যমে ভক্তরা নিজেদের জীবনে সেই শক্তির সংযোগ ঘটাতে চান। মঙ্গল গ্রহের প্রভাব, লাল রং এবং হনুমানের অপরিসীম শক্তি একসঙ্গে মিলে মঙ্গলবারকে তাঁর পূজার জন্য বিশেষ দিন করে তুলেছে।

ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে শ্রীহনুমান বা বজরংবলী এক অসাধারণ ভক্তি, শক্তি ও সাহসের প্রতীক। রামভক্ত হনুমান কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন, তিনি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের অবলম্বন। তাঁর নামে মানুষ সাহস ফিরে পায়, অশুভ শক্তিকে ভয় পায় না, আর জীবনের সংকটে দৃঢ় হয়ে ওঠে। মঙ্গলবার ও শনিবার হনুমানের পূজা করার বিশেষ দিন হিসেবে মানা হয়। এর মধ্যে মঙ্গলবারে তাঁর গায়ে সিঁদুর অর্পণ করার রীতি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন এই আচার এত তাৎপর্যপূর্ণ, তা বোঝার জন্য আমাদের পৌরাণিক কাহিনি, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব একসঙ্গে দেখতে হবে।

রামায়ণের একটি কাহিনি অনুসারে, একদিন হনুমান দেখলেন সীতামাতা প্রতিদিন কপালে সিঁদুর পরছেন। কৌতূহলী হনুমান সীতার কাছে জানতে চান এর কারণ। সীতা স্নেহভরে উত্তর দেন, এই সিঁদুর তিনি পরেন প্রভু শ্রীরামের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায়। ভক্ত হনুমানের কাছে এই উত্তর ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর। তিনি মনে করলেন, যদি সীতার কপালের সামান্য সিঁদুর রামের মঙ্গল বয়ে আনে, তবে নিজের সমগ্র শরীর জুড়ে সিঁদুর মেখে নিলে নিশ্চয়ই রামচন্দ্র চিরকাল অক্ষয় ও অমর হবেন। এই ভাবনা থেকেই তিনি সারা শরীরে সিঁদুর মেখে নেন। ভগবান রাম এই ভক্তির প্রকাশ দেখে অভিভূত হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ দেন, ভবিষ্যতে যে ভক্ত হনুমানকে সিঁদুর অর্পণ করবে, সে জীবনের দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে, সাহস ও শক্তি লাভ করবে এবং সব অশুভ প্রভাব দূর হবে। এই আশীর্বাদের পর থেকেই হনুমানের গায়ে সিঁদুর লাগানোর রীতি প্রচলিত হয়।

মঙ্গলবার দিনটি নিজেই শক্তি ও সাহসের প্রতীক। জ্যোতিষশাস্ত্রে মঙ্গল গ্রহকে যোদ্ধাদের গ্রহ বলা হয়। এর রং লাল, যা শক্তি, রক্ত, প্রাণশক্তি ও অগ্নির প্রতীক। মঙ্গলবারে হনুমানের পূজা করার মাধ্যমে ভক্তরা নিজেদের জীবনে সেই শক্তির সংযোগ ঘটাতে চান। মঙ্গল গ্রহের প্রভাব, লাল রং এবং হনুমানের অপরিসীম শক্তি একসঙ্গে মিলে মঙ্গলবারকে তাঁর পূজার জন্য বিশেষ দিন করে তুলেছে।

সিঁদুরের রং লাল হওয়ায় তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও অনেক। লাল মানে আগুন, মানে প্রাণশক্তি, মানে প্রেম ও ভক্তি। ভক্তরা যখন হনুমানজির গায়ে সিঁদুর অর্পণ করেন, তখন তাঁরা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের জীবনের ভয়, দুর্বলতা ও নেতিবাচকতাকে আগুনের মতো পুড়িয়ে ফেলতে চান। একই সঙ্গে সিঁদুর তাঁদের মনে করিয়ে দেয়, হনুমানের যে অগাধ ভক্তি ছিল শ্রীরামের প্রতি, সেই ভক্তির অনুকরণে আমরাও যেন নির্ভীক ও অনুরাগী হই।

ভক্তদের বিশ্বাস, মঙ্গলবারে সিঁদুর অর্পণ করলে জীবনের নানা উপকার হয়। শত্রুরা ক্ষতি করতে পারে না, অশুভ শক্তি বা ভূত-প্রেতের ভয় কেটে যায়, মন সাহসী হয়ে ওঠে, মানসিক রোগ ও ভয় দূর হয়, জীবনে উন্নতির পথ খুলে যায়। যারা কর্মক্ষেত্রে বা সংসারে বাধার সম্মুখীন হন, তাঁরা বিশেষভাবে মঙ্গলবারে হনুমানের পূজা করে স্বস্তি পান।

পূজার আচারেও একটি বিশেষ নিয়ম আছে। ভক্তরা মঙ্গলবার সকালে বা সন্ধ্যায় স্নান সেরে লাল বা কমলা রঙের পোশাক পরে মন্দিরে যান। হাতে থাকে সিঁদুর, তেল, চন্দন ও প্রসাদ। পূজা শুরুর আগে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতাকে স্মরণ করা হয়। তারপর হনুমানের মূর্তিতে সিঁদুর অর্পণ করা হয়। অনেকেই হনুমান চালীসা পাঠ করেন, যা ভক্তির অন্যতম প্রকাশ।

শুধু ধর্মীয় দিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই আচার তাৎপর্যপূর্ণ। জীবনের ভয় ও অস্থিরতার সময় মানুষ যখন হনুমানের পূজা করে, তখন তারা মনে শান্তি ও শক্তি অনুভব করে। সিঁদুরের উজ্জ্বলতা যেন ভক্তকে মনে করিয়ে দেয়, সে দুর্বল নয়, সে বজরংবলীর ভক্ত, তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।

ভারতের নানা জায়গায় এই আচার সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র মঙ্গলবারে হনুমান মন্দিরে ভিড় জমে। বাংলার কালীঘাট, দিল্লির হনুমান মন্দির, বারাণসীর সংকটমোচন হনুমান মন্দিরে এই দিনে বিশেষ পূজা হয়। ভক্তরা সিঁদুর মাখিয়ে হনুমানজিকে রক্তিম রঙে রাঙিয়ে দেন, আর নিজের ভক্তিকে নতুনভাবে প্রকাশ করেন।

অতএব বোঝা যায়, বজরংবলীর গায়ে সিঁদুর লাগানো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং তা ভক্তির প্রতীক। সীতার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের শরীর সিঁদুরে ঢেকে দেওয়া হনুমানের সেই অগাধ ভক্তি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত। মঙ্গলবারে সিঁদুর অর্পণের মাধ্যমে ভক্তরা নিজের জীবনে শক্তি, সাহস ও রক্ষাকবচ লাভ করেন। এটি ভক্তি ও আত্মবিশ্বাসের এক অমূল্য প্রকাশ, যা মানুষকে প্রতিকূলতার সামনে লড়াই করার শক্তি দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *