হিমালয় পর্বত ভারতের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

Spread the love

হিমালয় ভারতের জন্য শুধু একটি পর্বতমালা নয়, বরং এটি ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। উত্তরের আকাশছোঁয়া তুষারাবৃত এই পাহাড়শ্রেণি যেন প্রাকৃতিক এক দুর্গ, যা ভারতকে বাইরের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে। চীন, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত হিমালয়ের গা বেয়ে গড়ে উঠেছে। অগম্য পাহাড়ি পথ আর ভয়ঙ্কর শৃঙ্গের কারণে বিদেশি আক্রমণকারীদের জন্য এই দিক থেকে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। তাই ভারতের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে হিমালয় অপরিসীম ভূমিকা পালন করে।

হিমালয় ভারতের নদীসমূহের জন্মস্থান। গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশাল নদীগুলি এখান থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। হিমবাহ গলে যে জল সৃষ্টি হয়, তা বছরের পর বছর ধরে এই নদীগুলিকে প্রাণবন্ত রাখে। ফলে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ সমভূমি পৃথিবীর অন্যতম উর্বর কৃষিক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি ভারতীয় কৃষক তাদের জীবন ও জীবিকার জন্য হিমালয়ের উপর নির্ভরশীল।

এই পাহাড়শ্রেণি ভারতের জলবায়ুকেও নিয়ন্ত্রণ করে। উত্তর দিক থেকে আসা তীব্র ঠান্ডা সাইবেরিয়ান হাওয়া হিমালয় বাধা দিয়ে দেয়, যার ফলে ভারতের সমতলভূমি তুলনামূলক উষ্ণ থাকে। আবার বর্ষার সময় মৌসুমি বাতাস হিমালয়ের গায়ে আঘাত করে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই বৃষ্টিই ভারতের কৃষি উৎপাদনের মূল ভরসা। তাই হিমালয়কে ভারতের জলবায়ুর রক্ষাকবচও বলা যায়।

প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবেও হিমালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এই অঞ্চলের ঘন বনভূমি, ঔষধি গাছপালা, কাঠ এবং খনিজ পদার্থ ভারতের অর্থনীতি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় ভূমিকা রাখে। বিরল ভেষজ গাছ যেমন আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হয়, তেমনি বনভূমি ভারতের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

হিমালয় ভারতের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও ধারক। কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, অমরনাথ কিংবা কৈলাস-মানসসরোবর—এসব স্থান শুধু তীর্থ নয়, ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার প্রতীকও। প্রতি বছর কোটি কোটি ভক্ত এই স্থানগুলোতে যাত্রা করেন। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রেও হিমালয় ভারতের অন্যতম আকর্ষণ। কাশ্মীর, হিমাচল, উত্তরাখণ্ড, সিকিম কিংবা অরুণাচলের অপার সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের টানে।

হিমালয় ভারতের জীবনীশক্তির মতো। এটি সীমান্তকে নিরাপদ রাখে, নদীর মাধ্যমে কোটি মানুষের জীবনধারণের উপায় তৈরি করে, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে, প্রাকৃতিক সম্পদ সরবরাহ করে, আবার একই সঙ্গে ভারতের সংস্কৃতি, ধর্ম ও পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এক কথায়, হিমালয় ছাড়া ভারতকে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।

হিমালয়ের গুরুত্ব বোঝাতে গেলে তার জীববৈচিত্র্যের কথাও না বললেই নয়। পৃথিবীর অনেক বিরল প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসভূমি এই পাহাড়শ্রেণি। তুষার চিতাবাঘ, লাল পান্ডা, হিমালয়ী ভাল্লুকের মতো প্রজাতি এখানকার অরণ্যে বাস করে। এছাড়া অজস্র পাখি ও ঔষধিগাছ এই অঞ্চলের সম্পদকে বৈচিত্র্যময় করেছে। ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমালয়ের এই জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অসামান্য।

হিমালয় ভারতের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে উৎপন্ন নদীগুলির প্রবাহশক্তি কাজে লাগিয়ে বহু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহই নয়, শিল্পোন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নও সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম বড় ভরসা হতে পারে এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি, যার মূল উৎস হিমালয়।

ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও হিমালয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানের সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত হওয়ায় এই অঞ্চল কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সীমান্ত বিরোধ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কৌশলগত সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই হিমালয় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই ভারতের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির কৌশল নির্ধারণে হিমালয়ের ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হিমালয় শুধু একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়, ভারতের মানসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। কবি-সাহিত্যিকেরা হিমালয়কে ভারতের গৌরব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মহিমা ভারতীয় শিল্প, সংগীত ও দর্শনে অমর হয়ে আছে। তাই হিমালয় ভারতের কাছে প্রকৃতি, রক্ষা, জীবন ও অনুপ্রেরণার এক অদ্বিতীয় উৎস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *