জাপানের উপর কেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল আমেরিকা?

Spread the love

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আসলে জাপানকে বাধ্য করতে চেয়েছিল আত্মসমর্পণে।

আমেরিকা কেন জাপানে পরমাণু বোমা ফেলেছিল, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। ১৯৪৫ সালে জার্মানি আগেই আত্মসমর্পণ করেছিল, কিন্তু জাপান তখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলিতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছিল এবং জাপানি সেনারা আত্মসমর্পণ না করে মৃত্যুকে বরণ করাই শ্রেয় মনে করছিল। আমেরিকা আশঙ্কা করছিল, যদি জাপানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আক্রমণ চালানো হয়, তবে লক্ষাধিক মার্কিন সেনা এবং কোটি জাপানি বেসামরিক মানুষ নিহত হতে পারে। তাই দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার উদ্দেশ্যে আমেরিকা এক চরম সিদ্ধান্ত নেয়।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আসলে জাপানকে বাধ্য করতে চেয়েছিল আত্মসমর্পণে। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় প্রথম বোমা ফেলা হয়, মুহূর্তের মধ্যে শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। তিন দিন পরে ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমা ফেলা হয়, যেখানে আবার হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। এই ভয়ঙ্কর ধ্বংসযজ্ঞের পর সম্রাট হিরোহিতো নিজে উদ্যোগ নিয়ে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন এবং ১৫ আগস্ট জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ থেকে সরে আসে।

তবে যুদ্ধ শেষ করার তাগিদ ছাড়াও আমেরিকার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের কাছে তাদের নতুন শক্তির প্রদর্শন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত প্রভাব বাড়াচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল সোভিয়েতকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করে দিতে যে, তাদের হাতে রয়েছে এমন এক অস্ত্র যা পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য একেবারে পাল্টে দিতে পারে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির বোমা ফেলার মাধ্যমে আমেরিকা শুধু জাপানকেই নয়, গোটা বিশ্বকেই দেখিয়ে দিয়েছিল তাদের সামরিক আধিপত্য।

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জাপানের ভিতরে বিভক্তি ছিল। অনেক রাজনীতিবিদ ও কিছু সেনা কর্মকর্তা আত্মসমর্পণের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু সামরিক নেতৃত্ব ও সম্রাট তখনও লড়াই চালিয়ে যেতে চাইছিলেন। জাপানের ঐতিহ্যগত “বুশিদো” নীতিতে আত্মসমর্পণকে কাপুরুষতা বলে মনে করা হতো। তাই স্বাভাবিক আলোচনায় যুদ্ধ থামানোর পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকা মনে করেছিল একমাত্র ভয়াবহ আঘাতই জাপানকে টেবিলে আনতে বাধ্য করতে পারে, আর তাই পরমাণু বোমা ব্যবহার করা হয়।

ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, জাপান তখন প্রায় আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে ছিল এবং বোমা ফেলার প্রয়োজন ছিল না। কেউ আবার যুক্তি দেন, যদি বোমা ব্যবহার না করা হতো, তবে যুদ্ধ আরও মাসের পর মাস চলত এবং প্রাণহানি আরও ভয়াবহ হতো। এছাড়া ম্যানহাটন প্রজেক্টে বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়েছিল। তাই বোমার কার্যকারিতা বাস্তবে পরীক্ষা করার মানসিকতাও হয়তো সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছিল।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনাগুলো শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি টেনে দেয়নি, বরং মানবসভ্যতার জন্যও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। পৃথিবী প্রথমবার দেখেছিল পারমাণবিক শক্তির ভয়াবহ ধ্বংসক্ষমতা। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সামরিক কৌশল এবং বিশ্বশক্তির ভারসাম্য সবকিছুর কেন্দ্রে পরমাণু অস্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায়।

আমেরিকার এই সিদ্ধান্তের মানবিক দিক নিয়েও প্রবল সমালোচনা হয়েছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির সাধারণ মানুষ, যাদের অনেকেই যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারান। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই গুরুতরভাবে আহত হন এবং তেজস্ক্রিয়তার কারণে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, জন্মগত সমস্যা ও অন্যান্য অসুখে ভুগতে থাকেন। এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও জোরালো করেছিল।

এখানে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসে—আমেরিকা কি আসলেই জাপানের বিরুদ্ধে দুইবার বোমা ফেলতে বাধ্য ছিল? অনেকে বলেন, হিরোশিমার পরপরই জাপান আসলে যুদ্ধ থামানোর মানসিকতায় ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতা ও সেনা নেতৃত্বের জেদের কারণে ঘোষণা বিলম্বিত হয়। যদি আমেরিকা দ্বিতীয় বোমা না ফেলত, তাহলে হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই জাপান আত্মসমর্পণ করত। তবে যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, দ্বিধাহীনভাবে আরও একটি ধাক্কা দিলে জাপান তৎক্ষণাৎ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে, আর তাই নাগাসাকিতে দ্বিতীয় আঘাত আসে।

এই ঘটনার আরেকটি প্রভাব ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসেই সোভিয়েতরা জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং মানচুরিয়ায় প্রবল আক্রমণ চালায়। অনেকে মনে করেন, জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল শুধু আমেরিকার পরমাণু বোমার জন্য নয়, সোভিয়েত ইউনিয়নের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর জন্যও। জাপান আশঙ্কা করছিল, যদি সোভিয়েতরা আরও অগ্রসর হয়, তবে জাপানের ভাগ্য হয়তো জার্মানির মতো দুইভাগ হয়ে যাবে। তাই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত ছিল একাধিক চাপের সম্মিলিত ফল।

আমেরিকা কেন জাপানে পরমাণু বোমা ফেলেছিল তার উত্তর একক নয়, বরং বহুমাত্রিক। যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা, নিজেদের শক্তি প্রদর্শন, সোভিয়েত ইউনিয়নকে কৌশলগত বার্তা দেওয়া, জাপানের জেদ ভাঙা এবং নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা—সব মিলিয়েই এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপকে অনেকেই অমানবিক এবং অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। এই দ্বন্দ্ব আজও ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদদের আলোচনায় জীবন্ত হয়ে আছে, আর হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসস্মৃতি মানুষকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় যে, পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *