ভারতের কোথায় কোথায় ‘টাকা’ তৈরি হয়?

Spread the love

তবে বাস্তবে নোট তৈরি হয় চারটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কারখানায়। এগুলিকে বলা হয় ‘কারেন্সি প্রিন্টিং প্রেস’। প্রতিটি কেন্দ্রেই নোট তৈরির জন্য অত্যাধুনিক মেশিন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ কর্মী রয়েছে।

ভারতে টাকা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়, দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তিও বটে। হাতে ধরা সেই রঙিন নোটগুলির পেছনে লুকিয়ে আছে বিশাল ইতিহাস, কড়া নিরাপত্তা আর গোপনীয় প্রযুক্তি। সাধারণ মানুষ হয়তো জানেন না, দেশের টাকা আসলে কোথায় তৈরি হয়। আসুন, জেনে নেওয়া যাক ভারতের নোট মুদ্রণের আসল কাহিনি।

ভারতে টাকা ছাপানোর দায়িত্ব মূলত রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-র হাতে। তবে বাস্তবে নোট তৈরি হয় চারটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কারখানায়। এগুলিকে বলা হয় ‘কারেন্সি প্রিন্টিং প্রেস’। প্রতিটি কেন্দ্রেই নোট তৈরির জন্য অত্যাধুনিক মেশিন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ কর্মী রয়েছে। নোট মুদ্রণ প্রক্রিয়াটি এতটাই কঠিন যে বাইরের কারও পক্ষে এর গোপনীয়তা ভাঙা প্রায় অসম্ভব।

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় নাশিক (মহারাষ্ট্র)-এর নাম। ব্রিটিশ আমলেই এখানে নোট ছাপার কাজ শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও নাশিক দেশের অন্যতম প্রধান নোট মুদ্রণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানেই প্রথমবার ভারতীয় নোটের ছাপ তৈরি হয়েছিল। এখনও বিপুল পরিমাণ নোট নাশিক থেকে সারা দেশে বিতরণ করা হয়।

এরপর আসে দেওয়াস (মধ্যপ্রদেশ)। ১৯৭৪ সালে এখানে ‘Bank Note Press’ স্থাপন করা হয়। দেওয়াস কারখানার বিশেষত্ব হলো এখানে শুধু নোট ছাপানো হয় না, বরং নোটে ব্যবহৃত নিরাপত্তা সুতো (Security Thread) এবং ওয়াটারমার্ক পেপারও তৈরি হয়। ফলে ভারতীয় মুদ্রার নিরাপত্তা আরও জোরদার হয়।

সালবনি (পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ) হল পূর্ব ভারতের নোট মুদ্রণের প্রধান কেন্দ্র। ১৯৯০-এর দশকে এখানে আধুনিক কারখানা তৈরি হয়। এর ফলে বাংলার পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্যও দ্রুত নোট সরবরাহ করা সম্ভব হয়। বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা সালবনি প্রেস ভারতের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

মাইসোর (কর্নাটক) দক্ষিণ ভারতের একমাত্র নোট মুদ্রণ কেন্দ্র। এটিই তুলনামূলকভাবে নতুন প্রেস হলেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত। এখান থেকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে নোট সরবরাহ করা হয়। দেশের চাহিদা মেটাতে মাইসোর প্রেস আজ অন্যতম ভরসার জায়গা।

শুধু তাই নয়, এই চারটি প্রেসের বাইরে ভারতে রয়েছে বিশেষ প্রতিষ্ঠান সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড মিন্টিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (SPMCIL)। এটি শুধু নোট নয়, ডাকটিকিট, পাসপোর্ট, ব্যাঙ্ক বন্ড এবং সিকিউরিটি পেপার তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতে টাকা ছাপানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয়। নোট তৈরির সময় ব্যবহার করা হয় বিশেষ কালি, কটন পেপার, ওয়াটারমার্ক, মাইক্রো-প্রিন্টিং, সিকিউরিটি থ্রেড, হিডেন ইমেজ এবং ইন্টাগ্লিও প্রিন্টিং-এর মতো প্রযুক্তি। প্রতিটি নোট একাধিক স্তরে পরীক্ষা করা হয়, যাতে জাল নোট তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

আজকের দিনে ভারতে প্রতিদিন কোটি কোটি নোট ছাপানো হয়। পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত নোট ধীরে ধীরে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়, আর তার জায়গায় নতুন নোট আনা হয়। ২০১৬ সালের নোটবন্দির সময় কোটি কোটি নতুন ৫০০ ও ২০০০ টাকার নোট মুদ্রণ করতে এই চারটি কারখানাই দিনরাত কাজ করেছিল।

ভারতে নোট মুদ্রণের এই ব্যবস্থা শুধু অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি নয়, দেশের আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। কয়েক দশক আগে যেখানে বিদেশ থেকে সিকিউরিটি পেপার আমদানি করতে হতো, আজ ভারত নিজেই সেই প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর।

অতএব, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহার করা সেই ছোট্ট নোটটির পেছনে রয়েছে দেশের চার কোণে বিস্তৃত বিশাল কর্মযজ্ঞ— নাশিক, দেওয়াস, সালবনি আর মাইসোরের অবদান। সাধারণ চোখে যেটি কেবল কাগজ মনে হয়, আসলে সেটিই ভারতের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *