পুজোর ছুটি হোক বা উইকএন্ড গেটওয়ে, ভ্রমণ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অনেকের কাছে বেড়ানো মানেই এক অস্বস্তির অভিজ্ঞতা—মোশন সিকনেস। গাড়ি, বাস, ট্রেন বা বিমানে চড়লেই কারও মাথা ঘোরে, কারও গা গোলায়, কারও আবার বমি বমি ভাব শুরু হয়। ফলে আনন্দময় সফরের স্বাদ ফিকে হয়ে যায় মুহূর্তেই।
ওষুধ খেয়ে অনেক সময় আরাম মেলে ঠিকই, কিন্তু তা সবসময় একমাত্র সমাধান নয়। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের আশেপাশেই রয়েছে কিছু সহজ ঘরোয়া উপায় যা মোশন সিকনেস কমাতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এই টোটকাগুলো ব্যবহার করলে ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে আরও আনন্দময়, ঝামেলাহীন ও স্মরণীয়।
মোশন সিকনেস আসলে কী?
মোশন সিকনেস হলো একটি অবস্থা যেখানে মস্তিষ্ক, চোখ এবং অন্তঃকর্ণের মধ্যে যোগাযোগে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়।
- যখন আমরা চলমান গাড়ি বা বাসে বসে থাকি, আমাদের চোখ বাইরের দৃশ্যকে দেখে যে আমরা স্থির আছি।
- কিন্তু আমাদের ভেতরের কানের ব্যালান্স সিস্টেম (ভেস্টিবুলার সিস্টেম) বুঝতে পারে আমরা নড়াচড়া করছি।
এই দুই তথ্যের অসঙ্গতির কারণে স্নায়ুতন্ত্র বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তৈরি হয় মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা ক্লান্তির মতো উপসর্গ।
মোশন সিকনেসের সাধারণ উপসর্গ
- মাথা ঘোরা
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
- গা গোলানো বা দুর্বল লাগা
- অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- শ্বাসকষ্ট বা উদ্বেগ অনুভব করা
- মনঃসংযোগে অসুবিধা
কারা বেশি ভোগেন এই সমস্যায়?
মোশন সিকনেসে সবাই আক্রান্ত হন না। তবে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি বেশি।
- শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
- মহিলাদের মধ্যে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় সমস্যা বেশি হতে পারে।
- যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও মোশন সিকনেস সাধারণত তীব্র হয়।
- খালি পেটে ভ্রমণ করলে অনেক সময় উপসর্গ বাড়ে।

ওষুধ নয়, ঘরোয়া উপায়
প্রকৃতির কাছে সব সমস্যার উত্তর থাকে। নিচে দেওয়া হলো এমন কিছু ঘরোয়া উপায় যা মোশন সিকনেস কমাতে কার্যকর।
১. আদা চিবিয়ে খাওয়া
আদা প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টি-নসিয়া হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা জিঞ্জারল উপাদান পাকস্থলীকে শান্ত করে।
- সফরের আগে এক টুকরো আদা চিবিয়ে খেলে আরাম পাওয়া যায়।
- চাইলে আদা দিয়ে চা তৈরি করে পান করতে পারেন।
- শুকনো আদার ক্যান্ডিও কাজে আসতে পারে।
২. লেবুর রস ও লবণ
লেবুর টক স্বাদ ও লবণের খনিজ উপাদান মিলে পেটকে শান্ত রাখে।
- সফরের সময় লেবুর টুকরো সঙ্গে রাখুন।
- অল্প লেবুর রসে এক চিমটে লবণ মিশিয়ে মুখে দিয়ে নিন।
- বমি বমি ভাব অনেকটা কমে যাবে।
৩. পুদিনা পাতা বা পুদিনা চা
পুদিনার গন্ধ স্নায়ুকে শিথিল করে।
- কিছু পুদিনা পাতা চিবিয়ে খেলে আরাম পাবেন।
- সফরের আগে বা মাঝে পুদিনা চা খেলে শরীর সতেজ থাকে।
- পুদিনার এসেনশিয়াল অয়েল থাকলে সেটার ঘ্রাণও কাজে লাগতে পারে।
৪. ঠান্ডা জল বারবার চুমুক দিয়ে খাওয়া
অল্প অল্প করে ঠান্ডা জল খেলে পেট ঠান্ডা থাকে, বমির প্রবণতা কমে। তবে একসঙ্গে বেশি জল খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
৫. হালকা শুকনো খাবার
খালি পেটে ভ্রমণ করলে সমস্যা বাড়ে। তাই সফরের আগে হালকা বিস্কুট, টোস্ট বা চিঁড়ে জাতীয় খাবার খেয়ে নিন। তৈলাক্ত ও ঝাল খাবার এড়িয়ে চলুন।
৬. সঠিক আসন বেছে নেওয়া
গাড়ির সামনের সিটে বা জানালার পাশে বসলে ঝাঁকুনি কম লাগে। তাজা বাতাস চলাচল করলে মাথা ঘোরার প্রবণতা কম হয়।
- ট্রেনে সামনের দিকে মুখ করে বসুন।
- বাস বা গাড়িতে জানালার পাশে বসা সবচেয়ে ভালো।
৭. গভীর শ্বাস নেওয়া
শরীর যখন অস্বস্তি বোধ করে, তখন ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে।
৮. সুগন্ধি থেরাপি
লেবু বা ল্যাভেন্ডারের হালকা সুগন্ধ অনেক সময় মোশন সিকনেস দূর করতে সাহায্য করে। একটি ছোট কটন বল বা রুমালে কয়েক ফোঁটা সুগন্ধি তেল দিয়ে নিলে আরাম মেলে।
কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ
- ভ্রমণের সময় মোবাইল বা বই পড়া এড়িয়ে চলুন।
- গাড়ির ভিতরে ভারী গন্ধ (পারফিউম, সিগারেটের ধোঁয়া) এড়িয়ে চলা উচিত।
- যতটা সম্ভব সোজা হয়ে বসুন, মাথা গাড়ির সিটে ঠেকিয়ে রাখুন।
- ভ্রমণের সময় ঢিলা পোশাক পরুন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
যদি ঘরোয়া উপায় কাজ না করে বা উপসর্গ অত্যধিক হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- দীর্ঘ সময় ধরে বমি চললে
- শরীরে অতিরিক্ত দুর্বলতা এলে
- মাথা ঘোরা ও কানে বাজবার সমস্যা হলে
চিকিৎসক অ্যান্টি-মোশন সিকনেস ট্যাবলেট প্রেসক্রাইব করতে পারেন।

মোশন সিকনেস নিঃসন্দেহে ভ্রমণের আনন্দকে নষ্ট করে দেয়। অনেকেই সুন্দর একটি ছুটি বা পুজোর সফরের জন্য দিন গুনে অপেক্ষা করেন, কিন্তু গাড়ি, বাস বা ট্রেনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা ক্লান্তির মতো উপসর্গ শুরু হলে পুরো অভিজ্ঞতাই মাটি হয়ে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো অদম্য সমস্যা নয়। সামান্য সচেতনতা, কয়েকটি ঘরোয়া টোটকা এবং জীবনধারায় কিছু পরিবর্তন আনলেই এই সমস্যাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
আদা, লেবু, পুদিনা—এসব ঘরোয়া উপকরণ যুগ যুগ ধরে বমি ও বমি বমি ভাব কমাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সফরে বেরোনোর আগে বা ভ্রমণের মাঝেই এগুলো ব্যবহার করলে শরীর হালকা লাগে এবং অস্বস্তি কমে। ঠান্ডা জল বারবার অল্প অল্প করে পান করা, সফরের আগে খালি পেটে না থাকা কিংবা জানালার পাশের আসনে বসা—এসব সহজ নিয়মও আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর। এগুলোর পাশাপাশি হালকা সঙ্গীত শোনা, গভীর শ্বাস নেওয়া বা কিছুটা ঘুমিয়েও নেওয়া মোশন সিকনেস থেকে মনকে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
কিন্তু সবসময় ঘরোয়া উপায় যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিশেষ করে যদি কারও সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর হয় বা দীর্ঘ সময় ধরে উপসর্গ চলতে থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তার অ্যান্টি-মোশন সিকনেস ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন, যা ভ্রমণের আগে খেলে বেশ ভালো কাজ করে। তবে ওষুধের ব্যবহার একেবারেই ব্যক্তিভেদে ভিন্ন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো খাওয়া উচিত নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিক প্রস্তুতি। অনেক সময় ভ্রমণের আগেই আমরা ধরে নিই যে, গাড়ি বা ট্রেনে উঠলেই মাথা ঘুরবে। এই ভয় ও উদ্বেগও আসলে শরীরকে বেশি দুর্বল করে তোলে। তাই সফরের আগে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করুন। নিজেকে বারবার আশ্বস্ত করুন যে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে ভ্রমণ নির্ঝঞ্ঝাট হবে।
এছাড়া ভ্রমণের সঙ্গীদের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি কারও মোশন সিকনেসের প্রবণতা জানা থাকে, তবে তাঁকে মাঝপথে ভারী খাবার খেতে জোর করা উচিত নয়। বরং হালকা খাবার, ঠান্ডা জল কিংবা লেবুর টুকরো সঙ্গে রাখতে সাহায্য করুন। গাড়ির ভেতরে জানালা খোলা রাখার চেষ্টা করুন যেন তাজা বাতাস চলাচল করে। ছোট ছোট এই উদ্যোগগুলো ভ্রমণকারীর অস্বস্তি অনেকাংশে দূর করতে পারে।
আজকের দিনে ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, অনেকের জীবিকার অংশ। প্রতিদিনই অফিস যাওয়া, দীর্ঘ যাত্রা কিংবা ব্যবসার কাজে দূরে যেতে হয়। তাই মোশন সিকনেস যদি জীবনের একটি স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটিকে অবহেলা করলে চলবে না। সঠিক তথ্য জেনে, ঘরোয়া টিপস প্রয়োগ করে এবং প্রয়োজনে ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিটি ভ্রমণই হওয়া উচিত আনন্দময়। সফরের স্মৃতি হওয়া উচিত প্রকৃতির সৌন্দর্য, নতুন জায়গার অভিজ্ঞতা আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময়কে ঘিরে। বমি বা মাথা ঘোরা যেন কখনোই আপনার যাত্রার মূল বিষয় হয়ে না ওঠে। তাই আগে থেকে প্রস্তুতি নিন, সহজ উপায়গুলো কাজে লাগান, প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন।
মোশন সিকনেসকে ভয় পেলে হবে না। বরং এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনুন এবং প্রতিটি ভ্রমণকে করে তুলুন স্মরণীয় ও উপভোগ্য। ভ্রমণ মানেই হোক হাসি, আনন্দ আর মুক্তির অনুভূতি—অস্বস্তি বা ক্লান্তির নয়।