বিজেপির ‘সারদার পুরস্কার’ তত্ত্বের মুখে তৃণমূলের পাল্টা যুক্তি: রাজীব কুমারকে কেন রাজ্যসভায় পাঠাল মমতা?

Spread the love

রাজীব কুমার রাজ্যসভা প্রার্থী হিসেবে তৃণমূলের তালিকায় নাম ওঠার পর থেকেই বাংলার রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যসভার চার প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে প্রবল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রাক্তন শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক রাজীব কুমার। বিরোধী বিজেপির দাবি— সারদা চিটফান্ড মামলায় তাঁর ভূমিকার ‘পুরস্কার’ হিসেবেই রাজীবকে রাজ্যসভায় পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে তৃণমূলের সাফ জবাব— এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ, প্রশাসনিক দায়িত্ব শেষ হলে যে কেউ রাজনীতিতে আসতেই পারেন। প্রশ্ন উঠছে, বিজেপির এই অভিযোগের বিপরীতে তৃণমূলের যুক্তি কী, আর কেনই বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজীব কুমারকেই বেছে নিলেন?

এই প্রতিবেদনে আমরা সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজব— তথ্য, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শহুরে ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ মিলিয়ে।


রাজীব কুমার: প্রশাসন থেকে রাজনীতি— বিতর্কের সূত্রপাত

কলকাতা পুলিশের কমিশনার থাকাকালীন সময় থেকেই রাজীব কুমার বারবার শিরোনামে এসেছেন। সারদা চিটফান্ড মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত, তাঁর বাসভবনে তল্লাশির চেষ্টা এবং সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ধরনায় বসা— এই সবকিছুই রাজ্য রাজনীতির স্মরণীয় অধ্যায়। অবসরের আগে রাজ্য পুলিশের ডিজি পদে থেকেছেন রাজীব। ফলে তাঁকে রাজনীতিতে আনা হবে— এমন গুঞ্জন বহুদিন ধরেই ছিল।

তবে রাজ্যসভা প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিতর্ক তুঙ্গে। বিজেপির বক্তব্য, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সারদা মামলায় ‘রক্ষাকবচ’ হয়ে ওঠার জন্যই রাজীবকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।


বিজেপির অভিযোগ: ‘সারদার পুরস্কার’

বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সারদা-কাণ্ডে লাল ডায়েরি এবং অন্যান্য ঘটনায় রাজীব কুমারের যে ভূমিকা ছিল, তারই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।” বিজেপির আরও অভিযোগ— রাজীব যদি মুখ খোলেন, তবে তৃণমূলের অস্বস্তি বাড়বে। তাই তাঁকে রাজনীতির নিরাপদ বৃত্তে নিয়ে আসা হচ্ছে।

এই অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বিজেপি এটিকে শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে দুর্নীতি-বিরোধী আবেগ উসকে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে।


তৃণমূলের পাল্টা যুক্তি: “টার্গেট করবেন না”

বিজেপির অভিযোগের জবাবে তৃণমূলের যুক্তি একাধিক স্তরে দাঁড়ানো।

১) প্রশাসনিক দায়িত্ব শেষ, নাগরিক হিসেবে রাজনীতির অধিকার

তৃণমূলের বক্তব্য— রাজীব কুমার অবসরপ্রাপ্ত। সংবিধান অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কোনও আমলা রাজনীতিতে যোগ দিলে তা বেআইনি নয়। অতীতেও বহু প্রাক্তন আমলা বিজেপি-সহ বিভিন্ন দলে যোগ দিয়েছেন।

২) ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ তত্ত্ব

তৃণমূল নেতা ফিরহাদ হাকিম প্রশ্ন তোলেন— বিজেপি কেন এই ক্ষেত্রে নৈতিকতার কথা বলছে, অথচ বিচারপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে আসা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়-এর ক্ষেত্রে আপত্তি করেনি? তাঁর কথায়, “রাজীব কুমারকে টার্গেট করবেন না। দায়িত্ব শেষ হলে তিনি যে কোনও পেশা বেছে নিতে পারেন।”

৩) আইনি দিক থেকে দোষ প্রমাণ হয়নি

তৃণমূলের দাবি— সারদা মামলায় রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে কোনও চূড়ান্ত দোষ প্রমাণ হয়নি। তদন্ত চলেছে, কিন্তু দোষী সাব্যস্ত না হলে কাউকে আজীবনের জন্য ‘অপরাধী’ আখ্যা দেওয়া যায় না।


কেন রাজীব কুমারই? মমতার রাজনৈতিক অঙ্ক

রাজীব কুমারকে বেছে নেওয়ার পেছনে কেবল ‘ব্যক্তিগত আনুগত্য’ নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্ক রয়েছে।

শহুরে ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকানো

লোকসভা নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শহুরে পুরসভাগুলিতে তৃণমূলের ফল আশানুরূপ হয়নি। শিক্ষিত, ইংরেজি-হিন্দি সাবলীল, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মুখ এনে শহুরে মধ্যবিত্তদের কাছে ‘স্টেবল গভার্ন্যান্স’-এর বার্তা দিতে চাইছে তৃণমূল।

দিল্লিতে প্রশাসনিক দক্ষতা

রাজ্যসভা মানে দিল্লির নীতিনির্ধারণী পরিসর। সেখানে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন প্রাক্তন ডিজির উপস্থিতি দলের পক্ষে কার্যকর হতে পারে— বিশেষত স্বরাষ্ট্র, আইন-শৃঙ্খলা ও ফেডারেল কাঠামো সংক্রান্ত বিতর্কে।


রাজ্যসভার তালিকায় ‘শহুরে ফোকাস’

এ বার তৃণমূল যে চারজনকে রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছে, তাঁদের সবার মধ্যেই একটি মিল রয়েছে— তাঁরা শহুরে, শিক্ষিত এবং মিডিয়া-ফ্রেন্ডলি।

  • কোয়েল মল্লিক: টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী, শহুরে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব।
  • বাবুল সুপ্রিয়: জাতীয় স্তরে পরিচিত মুখ, দিল্লির রাজনীতিতে অভিজ্ঞ।
  • রাজীব কুমার: প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা পরিসরের প্রতিনিধি।

এই তালিকা স্পষ্ট করছে— তৃণমূল এ বার গ্রামবাংলার পাশাপাশি শহুরে মধ্যবিত্তদেরও আস্থায় আনতে চাইছে।


বিজেপির আক্রমণ কতটা কার্যকর?

রাজীব কুমারকে ঘিরে ‘সারদার পুরস্কার’ তত্ত্ব বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারে জায়গা পাবে ঠিকই। তবে প্রশ্ন হল, ভোটাররা কতটা গ্রহণ করবেন?

  • হার্ডকোর বিজেপি সমর্থকরা এই যুক্তিতে আরও অনড় হবেন।
  • তৃণমূল সমর্থকরা দলীয় অবস্থানেই থাকবেন।
  • সুইং ভোটার বা শহুরে মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে বিষয়টি নির্ভর করবে— তাঁরা এটিকে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হিসেবে দেখছেন, না কি পুরনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি হিসেবে।

উপসংহার: বিতর্কই কি তৃণমূলের কৌশল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই রাজ্যসভা মনোনয়নে চমক দিতে ভালোবাসেন। বিতর্কিত কিন্তু পরিচিত মুখ এনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা— এটিও এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। রাজীব কুমারের ক্ষেত্রে সেটাই আবার দেখা গেল।

বিজেপি বলছে ‘সারদার পুরস্কার’, তৃণমূল বলছে ‘টার্গেট করবেন না’। শেষ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বের রায় দেবে সময় এবং জনমত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত— রাজীব কুমারের রাজ্যসভা মনোনয়ন শুধু একটি আসন পূরণ নয়, বরং শহুরে ভোটব্যাঙ্ক এবং দিল্লির রাজনীতিতে তৃণমূলের পরবর্তী চালের ইঙ্গিত।

এই কারণেই বলা যায়, রাজীব কুমার ইস্যু তৃণমূল বনাম বিজেপি লড়াইয়ের আরেকটি বড় অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে— যেখানে প্রশাসন, রাজনীতি এবং জনমতের সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।


সম্প্রতি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে, যেখানে বিরোধী দলের নেতারা সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। এর একটা স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা গেল শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিশ্রুতির ঘটনা, যেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৬তম ভোটেও হারবেন। এই বিবৃতি রাজ্যসভার মনোনয়ন বিতর্কের সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে রাজ্য রাজনীতির তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *