নতুন শ্রমবিধি: ৪৮ ঘণ্টা থাকল, তবু বদলে গেল কাজের ধরন—নতুন শ্রমবিধিতে কী পরিবর্তন এল?

Spread the love

ভারতের শ্রম আইন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি উঠছিল। সেই দাবি পূরণেই কেন্দ্রীয় সরকার আনছে নতুন শ্রমবিধি—যেখানে পুরনো মোট ২৯টি শ্রম আইনকে একীভূত করে চারটি বড় কোডের অধীনে আনা হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকেই ধাপে ধাপে এই নতুন বিধানগুলি কার্যকর হবে।

এই কোডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—কর্মঘণ্টা, শিফটের নিয়ম, অতিরিক্ত কাজের ক্ষতিপূরণ এবং কর্মীদের নিরাপত্তা। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টার নিয়ম অপরিবর্তিত থাকলেও দৈনিক সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা কাজের অনুমতি—এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ, আশঙ্কা ও আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

Hindustan Times Bangla–র প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে—সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা সীমা অপরিবর্তিত, তবে শ্রমিকের লিখিত সম্মতি থাকলে দৈনিক শিফট সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে ৪ দিনের কাজ + ৩ দিনের বিশ্রামের মতো নতুন কর্মপদ্ধতিও সম্ভব হবে।

এই পরিবর্তন ভারতের শ্রমবাজারে কী ধরনের বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে, কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ের জন্য কী সুবিধা বা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে—এই নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা থাকছে এই প্রতিবেদনে।


সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা সীমা অপরিবর্তিত

নতুন শ্রম কোডে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
সপ্তাহে সর্বোচ্চ কাজের সময় ৪৮ ঘণ্টাই থাকবে।

এই নিয়ম আগে যেমন ছিল, ঠিক তেমনই থাকছে। অর্থাৎ—

  • কোনও কর্মীকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না
  • এর বেশি কাজ করালে তা সম্পূর্ণভাবে ওভারটাইম বলে গণ্য হবে
  • এবং সেই অতিরিক্ত কাজের জন্য দু’গুণ মজুরি দেওয়া বাধ্যতামূলক

Hindustan Times Bangla প্রতিবেদনে এই তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।


দৈনিক শিফট ৮ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা

এটাই নতুন শ্রম আইনের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত।

আগে দৈনিক কাজের সময় ছিল সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা, কিন্তু নতুন কোডে বলা হয়েছে—

  • দিনের শিফট সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে
  • তবে এই অতিরিক্ত সময় বাধ্যতামূলক নয়
  • কর্মীর লিখিত সম্মতি ছাড়া দীর্ঘ শিফট চালু করা যাবে না

এর অর্থ, কর্মঘণ্টা বাড়েনি—শুধু সময় বণ্টনের নতুন নমনীয়তা এসেছে।

১২ ঘণ্টা শিফট মানে কি জোর করে বেশি কাজ?

না। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে—
দীর্ঘ শিফট চালু করতে হলে কর্মীর লিখিত অনুমতি অপরিহার্য।

কোনও কোম্পানি একতরফাভাবে ১২ ঘণ্টা শিফট চাপিয়ে দিতে পারবে না।


৪ দিনের কাজ + ৩ দিনের বিশ্রাম—নতুন সম্ভাবনা

নতুন শিফট নিয়মের কারণে এখন থেকে নিম্নলিখিত কর্মপদ্ধতিও সম্ভব—

  • ১২ ঘণ্টা × ৪ দিন = ৪৮ ঘণ্টা
    অর্থাৎ সপ্তাহে মাত্র চার দিন কাজ করলেই সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা পূরণ হয়ে যাবে।

একে অনেকেই বলছেন “কমপ্রেস্ড ওয়ার্ক উইক”।

এই পদ্ধতিতে—

  • কর্মীর টানা ৩ দিনের ছুটি পাওয়া সম্ভব
  • পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন, দক্ষতা উন্নয়ন বা পড়াশোনার জন্য বেশি সময় পাওয়া যাবে
  • অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষে শিফট পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে

তবে দীর্ঘ শিফট শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর হতে পারে, তাই কর্মীর সম্মতি ছাড়া এটি চালু করা যাবে না।


৮ ঘণ্টা × ৬ দিন পদ্ধতি কি বন্ধ হচ্ছে?

একদমই না।
আইন অনুযায়ী, আগের মতোই ৮ ঘণ্টার শিফট রেখে সপ্তাহে ৬ দিনের কাজ করা পুরোপুরি বৈধ।

যে কেউ চাইলে—

  • ৮ ঘণ্টা × ৬ দিন = ৪৮ ঘণ্টা
    এই আগের নিয়মেই কাজ করতে পারবেন।

অর্থাৎ, নতুন কোড পুরনো কাঠামোকে বাতিল করেনি—শুধু নমনীয়তা যোগ করেছে


ওভারটাইমের নিয়ম আরও কড়াকড়ি

নতুন বিধিতে ওভারটাইম সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ আছে—

  • ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে সেটা ওভারটাইম হবে
  • ওভারটাইমের মজুরি সাধারণ বেতনের দ্বিগুণ
  • ওভারটাইমের তথ্য কোম্পানিকে রেকর্ড আকারে সংরক্ষণ করতে হবে
  • কর্মীর সম্মতি ছাড়া ওভারটাইম করানো যাবে না
  • অতিরিক্ত কাজ করাতে চাইলে কোম্পানিকে আগেই কর্মীর লিখিত অনুমতি নিতে হবে

এতে কর্মীদের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়।


নতুন শ্রমবিধির লক্ষ্য—নমনীয়তা + সুরক্ষা

নতুন শ্রম কোড তৈরির সময় সরকার দুটি উদ্দেশ্য সামনে রেখেছে—

  1. ব্যবসায়িক পরিবেশকে সহজ করা (Ease of Doing Business)
  2. শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা

এরই অংশ হিসেবে:

  • সর্বজনীন ন্যূনতম মজুরি
  • শ্রমিকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার বাধ্যতামূলক
  • সামাজিক সুরক্ষা (PF, পেনশন, ESI) বিস্তৃতি
  • গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদেরও আইনের আওতায় আনা
  • গ্র্যাচুইটির নিয়মে সংস্কার
  • নারী কর্মীদের রাতের শিফটে সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ

এসব কিছু নিয়ে নতুন শ্রম কোড আলোচনায় এসেছে।


কর্মীদের জন্য সুবিধা

১. নিজস্ব সময় ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনতা

যারা দীর্ঘ ছুটি চান বা সপ্তাহে ৩ দিনের ছুটি পেলে সুবিধা হয়, তাদের জন্য ১২ ঘণ্টার শিফট একটি সুযোগ।

২. অতিরিক্ত কাজ করলে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক

আগেও ওভারটাইম ছিল, তবে এখন তা আরও কঠোরভাবে সংজ্ঞায়িত।

৩. লিখিত সম্মতির অধিকার

কোনও কোম্পানি কর্মীকে জোর করে ১০ বা ১২ ঘণ্টা কাজ করাতে পারবে না।

৪. সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ছে

PF, ESI, ইন্স্যুরেন্স, পেনশন—সব দিক থেকেই সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে।


নিয়োগকর্তাদের জন্য সুবিধা

১. অপারেশনাল ফ্লেক্সিবিলিটি

প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ শিফট চালু করলে উৎপাদন বা সার্ভিস ডেলিভারি আরও কার্যকর হতে পারে।

২. কর্মী শিফট পরিকল্পনা সহজ হবে

বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং, আইটি, সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে কমপ্রেস্ড ওয়ার্ক উইক কার্যকর হতে পারে।

৩. শ্রম আইন এখন আধুনিক ও সহজবোধ্য

পুরনো ২৯টি জটিল আইনের বদলে মাত্র ৪টি কোড—বিধির ভাষা সহজ, প্রয়োগ সহজ।


চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

১. দীর্ঘ শিফট শারীরিকভাবে কঠিন হতে পারে

১২ ঘণ্টা শিফট সব ধরনের কাজের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে।

২. ওভারটাইম রেকর্ড রাখা কঠিন

ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে সময়–রেকর্ড রক্ষণাবেক্ষণের আলাদা ব্যাবস্থা করতে হবে।

৩. কর্মী–স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সম্মতি থাকলেও দীর্ঘ সময় কাজ করালে ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৪. বাস্তবে অপব্যবহারের আশঙ্কা

আইন বলছে সম্মতি ছাড়া দীর্ঘ শিফট নয়। বাস্তবে সব জায়গায় কতটা মানা হবে—তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।


কোন কোন ক্ষেত্রে ১২ ঘণ্টার শিফট বেশি উপযোগী?

  • ম্যানুফ্যাকচারিং
  • FMCG ও প্যাকেজিং
  • আইটি ও BPO
  • গিগ কাজ (ডেলিভারি, রাইড–শেয়ারিং)
  • হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য পরিষেবা
  • কনস্ট্রাকশন

তবে এই সেক্টরগুলোতেও সেফটি গাইডলাইন কঠোরভাবে মানতে হবে।


ব্যবহারিক উদাহরণ—কর্মঘণ্টা কীভাবে হতে পারে?

নিচে ক’টি বাস্তব চিত্র দেওয়া হলো—

১. প্রচলিত ৮ ঘণ্টা কাজ (৬ দিন)

৮ × ৬ = ৪৮ ঘণ্টা
সপ্তাহে ১ দিন ছুটি
নিয়ম আগের মতোই।

২. ১০ ঘণ্টা কাজ (৫ দিন)

১০ × ৫ = ৫০ ঘণ্টা
২ ঘণ্টা ওভারটাইম → দ্বিগুণ মজুরি
২ দিন ছুটি।

৩. ১২ ঘণ্টা কাজ (৪ দিন)

১২ × ৪ = ৪৮ ঘণ্টা
৩ দিন ছুটি
নতুন কোড অনুসারে কর্মীর সম্মতি সাপেক্ষে।

এই তিনটি মডেল আইনের মধ্যে থেকেই প্রযোজ্য।


কোথায় ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে?

কিছু মানুষ ভুলভাবে ভাবছেন—

  • সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হবে
    → এটা ভুল। সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়।
  • সাপ্তাহিক কাজ ৬০ বা ৭২ ঘণ্টা হয়ে যাবে
    → ভুল। সাপ্তাহিক সীমা ৪৮ ঘণ্টা।
  • ১২ ঘণ্টা শিফট মানেই বেশি কাজ
    → না। মোট ঘণ্টা বাড়ছে না, শুধু ভাগ পরিবর্তন হচ্ছে।

আইনি সুরক্ষা কতটা শক্তিশালী?

নতুন শ্রম কোডে—

  • নজরদারি বাড়ানো হয়েছে
  • কোম্পানিকে ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে
  • কর্মী অভিযোগ করলে শ্রম দফতর দ্রুত তদন্ত করতে পারবে
  • জরিমানা ও শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে

এতে কর্মীরা আরও সুরক্ষিত হবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।


উপসংহার

নতুন শ্রমবিধি ২০২৫–এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—
সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার সীমা অপরিবর্তিত রেখে প্রতিদিন কাজ ভাগ করার স্বাধীনতা বাড়ানো।

এর ফলে—

  • কেউ চাইলে সপ্তাহে ৫ বা ৬ দিন ৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারবেন
  • আবার কেউ চাইলে সপ্তাহে মাত্র ৪ দিন ১২ ঘণ্টা কাজ করেও বাকী সময় বিশ্রাম নিতে পারবেন
  • অতিরিক্ত কাজ করালে নিয়োগকর্তাকে দ্বিগুণ মজুরি দিতে হবে
  • দীর্ঘ শিফট সম্পূর্ণরূপে কর্মীর সম্মতিনির্ভর

সর্বোপরি এই পরিবর্তনগুলোর উদ্দেশ্য হলো—
শ্রমিকের সুরক্ষা বজায় রেখে আধুনিক কর্মপদ্ধতিকে উৎসাহ দেওয়া।

বাস্তবে প্রয়োগ কতটা সফল হবে—তা নির্ভর করবে কোম্পানি, কর্মী এবং শ্রম দফতর—তিন পক্ষের দায়িত্বশীল প্রয়োগের ওপর।


You Can Also Check (Website Link)

আমাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে শ্রম আইনের আরও বিশদ বিশ্লেষণ ও আপডেট দেখতে পারেন:
https://newsprimetimes.com


Sources & References

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *