দেব এবং জিৎ — বাংলা সিনেমার দুই সুপরিচিত মুখ, তবে তাঁদের জনপ্রিয়তা, কর্মপদ্ধতি ও দর্শকদের সঙ্গে সম্পর্ক গঠনের পদ্ধতিতে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। এই দুই তারকার মধ্যে দূরত্ব এবং দেবের তুলনামূলক জনপ্রিয়তার কারণ একাধিক স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়।
ব্যক্তিত্ব ও পর্দার ইমেজের পার্থক্য!
দেব শুরু থেকেই নিজেকে একজন “পপুলার হিরো” হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তিনি ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘খোকাবাবু’, ‘বেঙ্গল টাইগার’, ‘পাগলু’ জাতীয় ছবির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে নিজের ভক্তে পরিণত করেছেন। তাঁর অভিনয় অনেক সময় অতিরঞ্জিত হলেও তিনি জানতেন কীভাবে “মাস অ্যাপিল” তৈরি করতে হয়।
অন্যদিকে, জিৎ মূলত নিজেকে একজন “ম্যাচিওর অ্যাকশন হিরো” হিসেবে তুলে ধরেছেন। ‘সাথী’ দিয়ে শুরু হলেও পরে তিনি বেশির ভাগ সময় অ্যাকশন বা রোমান্স নির্ভর ফর্মুলা ছবিতে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন। ফলে, জিৎ একটু বেশি সাবধানী ও কম পরীক্ষাধর্মী ছিলেন।
প্রোডাকশন ও ক্যারিয়ার ম্যানেজমেন্ট!
দেব নিজেই প্রোডিউসার হয়েছেন (Dev Entertainment Ventures), এবং নিজেকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন — ‘চৌকাঠ’, ‘চাম্প’, ‘কবীর’, ‘টনিক’, ‘প্রজাপতি’, ‘বাঘা যতীন’ — এগুলো দেবের একটা ভিন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করে। তিনি একজন ব্যবসাসফল তারকার বাইরেও একজন সৃজনশীল প্রযোজক ও অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন।
জিৎ যদিও নিজেও প্রযোজক (Jeetz Filmworks), কিন্তু তার ফিল্মোগ্রাফি তুলনামূলকভাবে বেশি বাণিজ্যিক ও নিরাপদ। খুব কমবারই তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন। ফলে তাঁর ইমেজ একটানা একইরকম থেকেছে।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও পাবলিক কানেকশন!
দেবের রাজনৈতিক যোগসূত্র (তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ) অনেকসময় সমালোচিত হলেও, এটি তাঁকে জনমানসে আরও বেশি পরিচিত করে তুলেছে। সাংসদ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নিজের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ কথা নয়। দেব এই ভারসাম্য বজায় রেখেছেন, যা তাঁকে একজন সংগ্রামী মানুষের ইমেজ দিয়েছে।
জিৎ রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও, জনসংযোগে তাঁর অংশগ্রহণ সীমিত। দেব বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সরব থাকেন, টক শো বা ডকুমেন্টারিতেও অংশ নেন। জিৎ বেশিরভাগ সময় নিজেকে গণমাধ্যম থেকে দূরে রাখেন।
দুজনের সোশ্যাল মিডিয়া ও ফ্যান বেস!
দেবের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলি যথেষ্ট সক্রিয়। তিনি তার সিনেমা ছাড়াও সামাজিক ইস্যু, পছন্দের বই, খেলাধুলা — এসব নিয়েও পোস্ট করেন। ফলে তাঁর সঙ্গে ভক্তদের একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। অন্যদিকে জিৎ একটু গম্ভীর ও দূরত্ব বজায় রাখা পছন্দ করেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় কম সক্রিয় এবং সাধারণত নিজের ছবি নিয়েই পোস্ট করেন।
দুজনের ছবির ধরন ও সাম্প্রতিক সাফল্য!
গত কয়েক বছরে দেব ‘গোলন্দাজ’, ‘টনিক’, ‘প্রজাপতি’, ‘বাঘা যতীন’-এর মতো ছবির মাধ্যমে ক্রিটিক এবং বক্স অফিস — দুই দিকেই সফল হয়েছেন। এগুলো ছিল ভিন্নধর্মী ছবি। দেব আজকাল শুধু মেনস্ট্রিম নয়, প্যারালাল ঘরানার মধ্যেও কাজ করছেন।
জিৎ সাম্প্রতিক ছবিতে বারবার সেই পুরোনো অ্যাকশন হিরোর চেহারায় ফিরে আসছেন। যেমন, ‘চেঞ্জচেম্প’, ‘বুমেরাং’, ‘মানুষ’, ‘চালবাজ’-এর মতো ছবিতে খুব একটা নতুনত্ব নেই।

দেব-জিৎ-এর সম্পর্ক কেমন?
দেব ও জিৎ-এর সম্পর্ক বরাবরই পেশাদার। ব্যক্তিগত শত্রুতা কখনও প্রকাশ্যে আসেনি, কিন্তু তাঁদের একসঙ্গে ছবি বা মঞ্চে খুব একটা দেখা যায় না। এর কারণ হতে পারে তাঁদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান। টলিউডে দুজনই সুপারস্টার, এবং তাঁদের মধ্যে তুলনা চলে নিয়মিত।
তবে উভয়েই একে অপরের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। দেব একাধিকবার বলেছেন যে তিনি জিৎকে শ্রদ্ধা করেন। জিৎও দেবের সাফল্য নিয়ে কখনও বিদ্বেষপূর্ণ কিছু বলেননি।
অর্থাৎ, জিৎ এবং দেবের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো “পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা”। দেব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করেছেন, দর্শকের চাহিদা বুঝেছেন, সাহস করে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, আর সামাজিক সংযোগও বজায় রেখেছেন। তাই তাঁর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।
জিৎ একজন স্টার হলেও নিজেকে তুলনামূলকভাবে গুটিয়ে রেখেছেন। ফলে তাঁর ফ্যান বেসে কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে না পারার কারণেই জিৎ এখন অনেকাংশে দেবের পিছনে পড়ে গিয়েছেন জনপ্রিয়তার দিক থেকে।