রঘু ডাকাত নামটি বাংলার লোককাহিনি, গান এবং জনশ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে “রঘু ডাকাত আসলে কে ছিলেন?”—এই প্রশ্নের উত্তর খুব সরল নয়, কারণ ইতিহাস আর লোককাহিনি এখানে মিলেমিশে গেছে।
বাংলার গ্রামীণ সমাজে রঘু ডাকাতকে একদিকে যেমন ভয়ঙ্কর ডাকাত হিসেবে মনে করা হয়, অন্যদিকে অনেকে তাঁকে এক ধরনের “লোকনায়ক” হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। ধারণা করা হয়, তিনি ১৮শ শতাব্দী বা ১৯শ শতকের গোড়ার দিকে অবিভক্ত বাংলার নদীবহুল অঞ্চলে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর আসল পরিচয় নিয়ে স্পষ্ট কোনো সরকারি দলিল নেই। তবে লোকমুখে শোনা যায়, রঘু মূলত ছিলেন গরিব পরিবার থেকে উঠে আসা এক ব্যক্তি, যিনি সমাজের অবিচার আর জমিদারদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে দস্যুবৃত্তি শুরু করেন।
রঘু ডাকাতকে নিয়ে বহু পালাগান, যাত্রাপালা এবং কীর্তনধর্মী গান রচিত হয়েছে। এসব গানে তাঁকে কখনও নিষ্ঠুর ডাকাত হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি গ্রামের লোককে লুট করতেন, আবার কখনও তাঁকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যেন তিনি ধনীদের কাছ থেকে লুট করে গরিবদের সাহায্য করতেন। ফলে তিনি কিংবদন্তির মতো দ্বৈত চরিত্র ধারণ করেছেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, রঘু ডাকাত আসলে ছিলেন নদীপথে সক্রিয় এক দস্যু। সেই সময় বাংলার নদীপথে “বড়ি ডাকাতি” খুবই প্রচলিত ছিল। নৌকো আটকিয়ে ধনসম্পদ লুট করা, জমিদার বা ব্যবসায়ীদের কনভয় আক্রমণ করা ছিল তাঁদের কাজ। রঘু সেই সব দস্যু দলের একজন নেতা ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোককাহিনির অলংকরণে রঘু ডাকাত এক ঐতিহাসিক চরিত্র থেকে অনেকটা “গল্পের নায়ক” হয়ে ওঠেন। অনেক গানেই শোনা যায়—“রঘু ডাকাতের কীর্তি”—যেখানে তাঁকে অর্ধেক ভয়ঙ্কর, অর্ধেক বীরপুরুষ হিসেবে দেখানো হয়। ফলে আজ রঘু ডাকাতকে ইতিহাসের নির্দিষ্ট এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আলাদা করা কঠিন, তিনি একদিকে বাস্তবের দস্যু, অন্যদিকে লোককাহিনির কিংবদন্তি।
রঘু ডাকাতকে ঘিরে বাংলার গ্রামীণ সমাজে একধরনের ভয় ও রোমাঞ্চ একসঙ্গে কাজ করত। গ্রাম্য মহলে রাতের অন্ধকার নামলেই মানুষজন তাঁর নাম শুনে শিহরিত হতো। লোকমুখে শোনা যায়, রঘু ডাকাত মাঝরাতে হঠাৎই হানা দিতেন ধনী জমিদার বা ব্যবসায়ীদের বাড়িতে। প্রচণ্ড দাপটে তিনি সবকিছু লুট করে নিয়ে যেতেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, অনেকে আবার দাবি করতেন, তিনি সাধারণ গরিব কৃষকের বাড়িতে কখনো হাত দিতেন না। এই দ্বৈত চরিত্রই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
লোককথার মাধ্যমে রঘু ডাকাতকে অনেক সময় রবিনহুডের মতো করে দেখা হয়েছে। যেমন কিছু গল্পে বলা হয়, তিনি জমিদার বা মহাজনের কাছ থেকে লুট করা সম্পদ গ্রামে গরিব মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এই কারণেই অনেক সাধারণ মানুষ তাঁকে ভয় পেলেও গোপনে শ্রদ্ধা করত। এমনকি আজও বাংলার কিছু অঞ্চলে “রঘু ডাকাতের ন্যায় বিচার” কথাটি শোনা যায়, যা বোঝায়—কেউ অন্যায়কারীর শাস্তি দিয়ে দুর্বলকে রক্ষা করছে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ আমলের রেকর্ডে রঘু ডাকাতের উল্লেখ খুব বেশি নেই। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তিনি হয়তো আঞ্চলিক স্তরে সক্রিয় ছিলেন, বড় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেননি। এ কারণেই সরকারি দলিলপত্রে তাঁর নাম তেমনভাবে উঠে আসেনি। তবে লোককাহিনিতে যেভাবে তাঁর প্রভাব দেখা যায়, তা প্রমাণ করে যে তিনি সাধারণ মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন।
বাংলার পালাগান ও যাত্রাপালায় রঘু ডাকাতকে নিয়ে বিশেষ ধরনের নাটকীয় উপস্থাপনা করা হয়। অনেক পালায় তাঁকে এক দুর্ধর্ষ চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়, যিনি তলোয়ার হাতে সবাইকে ভয় পাইয়ে দিতেন। আবার অনেক সময় সেই পালাতেই দেখা যায়, তিনি অন্যায়কারীর শাস্তিদাতা, একরকমের গ্রামীণ বিচারক। এভাবেই সাংস্কৃতিক চর্চায় রঘু ডাকাত একদিকে ভয়ের প্রতীক, অন্যদিকে ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
রঘু ডাকাত ছিলেন বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি দাঁড়ানো এক চরিত্র। হয়তো তিনি সত্যিই একজন দুর্ধর্ষ দস্যু ছিলেন, যিনি বাংলার নদীপথে লুটতরাজ চালাতেন। আবার লোককাহিনির অলংকরণে তিনি গরিবের ত্রাতা, অত্যাচারীর শত্রু হিসেবেও অমর হয়ে আছেন। ইতিহাস তাঁর প্রকৃত পরিচয় যতই মুছে দিক না কেন, বাংলার লোকগাথায় রঘু ডাকাত চিরকাল বেঁচে থাকবেন রহস্য, ভয় আর কিংবদন্তির প্রতীক হিসেবে।