অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, যিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ নামেই পরিচিত, তাঁর বয়স পেরিয়ে গিয়েছে ষাটের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁকে দেখলে তা বোঝা দুষ্কর। আজও তিনি তরুণ অভিনেতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিনয় করছেন, স্টাইল ও শরীরচর্চার দিক থেকে অনেককেই টেক্কা দিচ্ছেন। প্রশ্ন ওঠে- এই বয়সেও তিনি এত ফিট, চনমনে ও আত্মবিশ্বাসী কীভাবে? এর পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতা এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা এক জীবনশৈলী, যা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণাদায়ক।
প্রসেনজিতের ফিটনেস মূলত নির্ভর করে তিনটি স্তম্ভের ওপর—খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং মানসিক সংযম। তিনি সবসময়ই তার শরীরের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। ১৯৮০’র দশকে যখন বাংলা সিনেমায় তাঁর উত্থান শুরু, তখন থেকেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, শুধু অভিনয় নয়, নিজেকে ফিট রাখা এবং স্ক্রিন-ফ্রেন্ডলি করে তোলাই একজন নায়কের জন্য আবশ্যিক। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁর খাদ্যাভ্যাসে এসেছে কঠোর নিয়ম। তিনি অতিরিক্ত তেল, মশলা, প্রক্রিয়াজাত খাবার একেবারেই এড়িয়ে চলেন। নিয়মিত সময়ে খাওয়া, পর্যাপ্ত জলপান, এবং প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণই তাঁর খাদ্যতালিকার প্রধান উপাদান।
প্রসেনজিতের শরীরচর্চা রুটিনও অত্যন্ত কঠোর। তিনি নিয়মিত জিম করেন এবং শরীরের গঠন অনুযায়ী বিশেষ ব্যায়াম করে থাকেন। শুধু শরীর গঠন নয়, ফ্লেক্সিবিলিটি বজায় রাখতে যোগব্যায়াম এবং ফাংশনাল ট্রেনিংয়ের উপরও সমান গুরুত্ব দেন। দিনে ৭-৮ ঘণ্টা শ্যুটিংয়ের ফাঁকেও তিনি ব্যায়ামের সময় বের করে নেন। কখনও ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ, আবার কখনও রেসিস্ট্যান্স ট্রেনিং, আবার কিছু কিছু দিন কার্ডিও এক্সারসাইজ—এইভাবে ভ্যারিয়েশন রাখেন নিজের ফিটনেস রুটিনে, যাতে শরীর অভ্যস্ত না হয়ে পড়ে এবং সর্বদা সক্রিয় থাকে।
শুধু দেহচর্চাই নয়, প্রসেনজিত মানসিক দিক থেকেও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। তিনি নিজেকে সবসময় বিতর্ক, নেতিবাচক সংবাদ ও অবাঞ্ছিত স্ট্রেস থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। মিডিয়াতে খুব বেশি না থাকলেও, নিজের কাজের মাধ্যমে সবসময় আলোচনায় থাকেন। একান্ত ব্যক্তিগত জীবনকে গোপন রেখে তিনি নিজের পেশাগত জীবনকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। এই মনোভাবই তাঁকে ফোকাসড এবং মানসিকভাবে স্থির রেখেছে।

তিনি কখনও ধূমপান বা মদ্যপানের পথে যাননি। এমনকি পার্টি লাইফ থেকেও নিজেকে অনেকাংশে দূরে রেখেছেন। বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের সঙ্গেও মেপে-মেপে সময় কাটান। এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সংযমই তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। এমনকি ছবির চরিত্র অনুযায়ী ওজন কমানো বা বাড়ানোর মতো কঠিন কাজও তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন।
এইসবের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো, প্রসেনজিত চিরকাল শিখতে আগ্রহী। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলছেন। তাঁর কাছে বয়স শুধুই একটি সংখ্যা—নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিলেই যে কেউ সময়কে পেছনে ফেলে দিতে পারে, সেটিই তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন।
এই কারণে, আজও যখন প্রসেনজিৎ পর্দায় আসেন, দর্শকরা মুগ্ধ হন। কারণ সেখানে থাকে এক পরিণত অভিনেতার অভিজ্ঞতা, এক ফিট দেহের আত্মবিশ্বাস, আর এক জীবন্ত কিংবদন্তির আত্মসম্মান। তাঁর ফিটনেস শুধু বাহ্যিক নয়, এটি তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। এই অধ্যবসায়, নিয়ম ও সংযমের মিশেলই তাঁকে বাঙালির প্রিয় নায়ক করে রেখেছে যুগের পর যুগ।