চেন্নাই–হায়দরাবাদ বুলেট ট্রেনে নতুন যুগ—এ ধরনের হাই-স্পিড রুট কি ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেও আসতে পারে?

Spread the love

দক্ষিণ ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর আনতে চলেছে চেন্নাই–হায়দরাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প। বহু বছর ধরে দুই শহরের মধ্যে যাত্রার সময় ছিল কমপক্ষে বারো ঘণ্টা। এই দীর্ঘ ভ্রমণ সময়কে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা বহুদিন ধরে আলোচনায় ছিল, তা এখন বাস্তব রূপ নেওয়ার আরও কাছে পৌঁছে গেছে। প্রস্তাবিত করিডরটি চালু হলে চেন্নাই থেকে হায়দরাবাদ পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র দুই ঘণ্টা কুড়ি মিনিট। ফলে দক্ষিণ ভারতের পরিবহন মানচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

সাউথ সেন্ট্রাল রেলওয়ে ইতিমধ্যে করিডর সংক্রান্ত প্রস্তাব তামিলনাড়ু সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। সরকার সবুজ সঙ্কেত দিলেই শুরু হবে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন বা ডিপিআর প্রস্তুতের কাজ। এই প্রতিবেদন তৈরির মধ্য দিয়েই মূল নির্মাণকার্যের ভিত্তি স্থাপিত হবে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা এই প্রকল্পটি অনুমোদনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে বলেই সাধারণ মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। কারণ, এই করিডর চালু হলে তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশ—এই তিন রাজ্যের দৈনন্দিন যাতায়াত, বাণিজ্যিক পরিবেশ ও সামাজিক গতিশীলতা বহুলাংশে পরিবর্তিত হবে।

রুটের মোট দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ৭৭৮ কিলোমিটার, যা চেন্নাই ও হায়দরাবাদের মধ্যকার দূরত্বকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর করে তুলবে। সমগ্র পথ পরিকল্পনায় আধুনিক স্টেশন, ইন্টারচেঞ্জ এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা রেলের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিকেও নতুন গতি দেবে। চেন্নাইয়ের মিনজুর এলাকা এবং রিং রোডের নিকটে দুটি বড় স্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এই স্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে আশপাশের অঞ্চলে নতুন বাণিজ্য কেন্দ্র ও আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল, যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য উৎস হতে পারে।

করিডরের মধ্যে তামিলনাড়ুর অংশ মোট ৬১ কিলোমিটার। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ১১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি প্রকল্পটির অন্যতম জটিল অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে প্রকৌশলীরা রুট এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন যাতে কোনো বনাঞ্চলের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব না পড়ে। পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হওয়ায় পরিবেশগত অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক সহজ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চেন্নাই–হায়দরাবাদ বুলেট ট্রেন করিডরের প্রস্তাবিত উঁচু রেলপথ ও সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে অগ্রসর উচ্চগতির ট্রেনের দৃশ্য।

রুটকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে গেলে বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে। করিডরটি মোট ৬৫টি রাস্তা ও ২১টি বিদ্যুতের লাইন অতিক্রম করবে। ফলে নির্মাণপর্বে বিদ্যুৎ দপ্তর, সড়ক উন্নয়ন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য হবে। বিশেষত চেন্নাইয়ের উত্তরাঞ্চলের মধুর, ভিচুর ও ঠাচুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ কাজ পরিচালনা করতে আরও সতর্কতা প্রয়োজন হবে। এসব অঞ্চলে নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি না করাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

চেন্নাই–হায়দরাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি শুধু দুই শহরকে দ্রুতগামী রেলপথে যুক্ত করবে না। এটি দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তর একটি হাই-স্পিড নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনারও অংশ। এই বৃহৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে হায়দরাবাদ–বেঙ্গালুরু বুলেট ট্রেন রুট, যা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ভারতের প্রধান প্রযুক্তিনগরী ও শিল্পকেন্দ্রগুলো আধুনিক গতিসম্পন্ন রুটের মাধ্যমে যুক্ত হবে। দুটি রুট তৈরি হলে চেন্নাই ভারতের বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাব হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে হায়দরাবাদ থেকে চেন্নাই, চেন্নাই থেকে বেঙ্গালুরু এবং বেঙ্গালুরু থেকে হায়দরাবাদ—এই ত্রিমুখী সংযোগ দক্ষিণ ভারতের শিল্প ও আইটি খাতকে শক্তিশালী করবে।

বুলেট ট্রেনের গতি ঘণ্টায় তিনশ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। জাপান বা ইউরোপের মতো উচ্চগতির রুটে যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, ভারতও সেই মান বজায় রাখতে চাইছে। আধুনিক কোচ, শব্দহ্রাস ব্যবস্থা, উন্নত বায়ু চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ডিটেকশন সিস্টেম—সব মিলিয়ে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বিমানযাত্রার মতোই আরামদায়ক করতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় রেলওয়ে ইতিমধ্যেই হাই-স্পিড রেল করিডর নির্মাণে বহুবিধ আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শ গ্রহণ করছে, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিচালিত হয়।

যদি সরকার ডিপিআর প্রস্তুতির অনুমোদন দেয়, তবে পরবর্তী ধাপ হবে জমি অধিগ্রহণ, স্টেশন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, প্রাথমিক নির্মাণের প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা। পাশাপাশি রুটের কিছু অংশ পরিবর্তনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গুদুরের পরিবর্তে রুট তিরুপতির দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব উঠেছে, যা যাত্রীসংখ্যা বাড়াতে এবং সংযোগ উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। আরও একটি সম্ভাব্য সংযোজন হিসেবে পরীক্ষা চলছে হায়দরাবাদ–অমরাবতী–চেন্নাই–বেঙ্গালুরু সংযোগের, যাতে সমগ্র দক্ষিণ ভারত একটি সমন্বিত হাই-স্পিড নেটওয়ার্কের আওতায় আসে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়িক ভ্রমণে ব্যাপক সুবিধা আসবে। হায়দরাবাদের কোনও শিল্পপতি বা আইটি পেশাদার সকালে মিটিং শেষে বিকেলেই চেন্নাই থেকে ফিরে যেতে পারবেন। একইভাবে চেন্নাইয়ের উন্নত হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বন্দর সুবিধা তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশের মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য হবে। দক্ষিণ ভারতের প্রযুক্তিখাত, বিশেষত আইটি ও বায়োটেক শিল্প দ্রুত যোগাযোগ সুবিধার ফলে আরও দ্রুত বিকশিত হতে পারে। পাশাপাশি পর্যটন খাতে চাহিদা বাড়বে, কারণ দুই শহরই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

স্টেশনগুলোর আশপাশে নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বিস্তৃত হবে। নির্মাণ পর্যায়ে হাজার হাজার দক্ষ ও আধা–দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে, আর নির্মাণশেষে স্টেশন পরিচালনা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, হোটেল শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বহু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে এই প্রকল্প তিনটি রাজ্যের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দক্ষিণ ভারতের বহু বাসিন্দার কাছে বুলেট ট্রেন দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেতে এখন শেষ কয়েকটি ধাপই বাকি। সরকারের অনুমোদন ও প্রকল্প প্রতিবেদনের কাজ এগোলে চেন্নাই–হায়দরাবাদ বুলেট ট্রেন দক্ষিণ ভারতের ভ্রমণ, অর্থনীতি, শিল্প ও সমাজকে এক নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যাবে। এটি চালু হলে শুধু সময় সাশ্রয়ই হবে না, বরং পরিবর্তিত হবে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগের ধরন, শহরগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক উন্নয়নের গতি।


Sources & References

  • “Travel time to be slashed from 12 to 2.20 hours once Chennai-Hyderabad Bullet Train project takes off” — DtNext (নভেম্বর ২০২৫) dtnext
  • “Chennai-Hyderabad Bullet Train Update: SCR Submits Revised Route With Tirupati Station, Seeks Tamil Nadu Approval” — TheDailyJagran.com (নভেম্বর ২০২৫) The Daily Jagran
  • “Chennai-Hyderabad bullet train project moves into next phase” — chennaivision.com (নভেম্বর ২০২৫) chennaivision.com
  • “Hyderabad–Chennai high-speed rail corridor set to boost regional connectivity…” — TravelAndTourWorld.com (নভেম্বর ২০২৫) Travel And Tour World
  • Project page of NHSRCL (ওফিশিয়াল): “Project Overview” — NHSRCL official website nhsrcl.in+1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *