ভবানীপুরে ফের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন— ‘একটা ভোটে হলেও জিতব’

Spread the love

ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা করলেন। ভোটের আগে বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, নিজের কেন্দ্র ভবানীপুর থেকেই তিনি লড়বেন। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাম বাদ যাওয়ার বিতর্কের মাঝেই তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা— “একটা ভোটে হলেও আমি জিতব।” সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬— ভবানীপুরে এক জনসভা থেকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ভোটের অঙ্ক যত কঠিনই হোক না কেন, তিনি নিজের কেন্দ্র থেকেই লড়বেন এবং সেখান থেকেই জিতবেন। এমনকী, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, “একটা ভোটে হলেও আমি ভবানীপুর থেকে জিতব।”

মমতার এই মন্তব্য ঘিরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র চর্চা। একদিকে যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী নিজের শক্ত ঘাঁটিতে ফের জয়ী হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী, অন্যদিকে সেখানে তাঁর এই বক্তব্যকে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিরোধী শিবির, বিশেষ করে Bharatiya Janata Party (বিজেপি)।


ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি

উল্লেখযোগ্যভাবে, এসআইআর (Special Intensive Revision) বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া শুরুর আগে থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে পরিকল্পিতভাবে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, যাতে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করা যায়।

এই ইস্যুতে তিনি শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদেই থেমে থাকেননি, বরং বিষয়টি নিয়ে Supreme Court of India-এর দ্বারস্থও হয়েছিলেন। যদিও কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সমস্ত কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য— বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।

মমতার কথায়,
“দিল্লিতে বিজেপির পার্টি অফিসে বসে ঠিক করা হচ্ছে কার নাম থাকবে, কার নাম কাটা হবে। আর এখানে এসে রথযাত্রা করছে। এই রথযাত্রাই হবে আপনাদের শেষ রথযাত্রা।”


ভবানীপুরে ভোটার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন

ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রকে রাজনীতির পরিভাষায় ‘ছোট কেন্দ্র’ হিসেবেই ধরা হয়। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই মনে করিয়ে দেন, এই কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা আনুমানিক ২.৬ লক্ষ। অথচ, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, এক ধাক্কায় ৪৭ হাজারেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে।

মমতার প্রশ্ন—
“লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ১৪ হাজার, তার উপর আরও ২ হাজার নাম কাটা হয়েছে। এত মানুষ হঠাৎ কোথায় গেল? ভোটাররা কোথায়? কেন তাঁরা মিসিং?”

তিনি জানান, প্রশাসনিক স্তরে এবং আইনি স্তরেও তিনি সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন। শান্তিপূর্ণভাবে সহযোগিতা করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর অভিযোগ— ইচ্ছাকৃতভাবেই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, এখনও প্রায় ১৪ হাজারের বেশি নাম রয়েছে অমীমাংসিত তালিকায়। ফলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলের।


“ভীরুরাই পিছন থেকে আক্রমণ করে”— মমতার তোপ

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা বলেন,
“যাঁরা ভীরু, তাঁরাই পিছন থেকে আক্রমণ করে। ভোটে লড়াই করতে না পেরে সাধারণ মানুষের নাম কেটে জেতার চেষ্টা করছে বিজেপি।”

এই মন্তব্যের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন, তাঁর মতে বিজেপি মাঠের লড়াইয়ে টিকতে না পেরেই প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে।

মমতার দাবি,
“আমার কেন্দ্রে প্রায় ৬০ হাজার ভোট কাটা হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমি বলছি, আমি জিতব। এক ভোটে হলেও জিতব।”


ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের উপর বিশ্বাস

নিজের বক্তব্যে একাধিকবার সাধারণ মানুষের উপর আস্থা রাখার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন,
“আমার বিশ্বাস আছে ভগবানে, বিশ্বাস আছে মায়ের উপর, বিশ্বাস আছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান— সব মানুষের উপর।”

তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে তিনি ধরনায় বসবেন। তবে এই আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক এবং মানুষের নৈতিক সমর্থনের উপর ভর করেই। ভোটার তালিকা বিতর্ক নিয়ে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মমতা আবারও তাঁর পরিচিত ‘স্ট্রিট ফাইটার’ রাজনৈতিক সত্তাকে সামনে আনলেন— যিনি ভোটের ময়দানে যেমন লড়াই করেন, তেমনই প্রয়োজনে রাজপথেও নামতে দ্বিধা করেন না।


ভবানীপুর ও মমতা: এক রাজনৈতিক ইতিহাস

ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর নন্দীগ্রামে হারের পর ভবানীপুর উপনির্বাচনেই মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকার সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েছিলেন তিনি।

সেই উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেকর্ড ৫৮,৮৩৫ ভোটে জয়ী হন। তার আগে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, যিনি পরে আসন ছেড়ে দেন মমতার জন্য।

এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, ভবানীপুর শুধু একটি কেন্দ্র নয়— এটি মমতার রাজনৈতিক পুনরুত্থানের প্রতীক।


বিজেপির কটাক্ষ: “ভয়ের রাজনীতি”

মমতার বক্তব্যের পর পাল্টা আক্রমণে নামে বিজেপি। রাজ্য বিজেপির নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন,
“যে নেত্রী একসময় ভবানীপুরে ৭৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন, তাঁকেই এখন ভোটের দু’মাস আগে বলতে হচ্ছে— একটা ভোটে হলেও জিতব। এর মানে তৃণমূলের বুকে হেরে যাওয়ার ভয় ঢুকে গেছে।”

বিজেপির দাবি, এই ভয় শুধু ভবানীপুরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা বাংলা জুড়েই পরিবর্তনের হাওয়া বইছে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আত্মবিশ্বাস না কি চাপ?

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মমতার বক্তব্যকে শুধুই আবেগঘন ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ভোটার তালিকা বিতর্ককে সামনে এনে তিনি একদিকে যেমন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার উপর প্রশ্ন তুলছেন, অন্যদিকে তেমনই নিজের সমর্থকদের আরও সংঘবদ্ধ করছেন।

অন্যদিকে, বিরোধীদের মতে, এত বড় জয়ের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ‘এক ভোটে হলেও জিতব’— এই বক্তব্যে একটা চাপের ইঙ্গিত রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর এই মন্তব্য আসন্ন নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে যাই হোক, এটুকু স্পষ্ট— ভবানীপুর আবারও রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।


সামনে কী?

ভোটের দিন যত এগোবে, ততই ভবানীপুরের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ভোটার তালিকা, কমিশনের ভূমিকা, আইনি লড়াই এবং রাজপথের আন্দোলন— সব মিলিয়ে এই কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা বাংলা।

একদিকে আত্মবিশ্বাসী মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে আগ্রাসী বিরোধী শিবির— শেষ হাসি কে হাসবে, তার উত্তর দেবে ব্যালট বাক্সই।

তবে আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা স্পষ্ট—
“ভবানীপুর আমার লড়াইয়ের ময়দান। আর এখান থেকেই আমি জিতব— একটা ভোটে হলেও।”


“আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাজ্যসভার প্রার্থী রাজীব কুমার-কে কেন্দ্র করে। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে যে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে ‘সারদার পুরস্কার’ হিসেবে। বিজেপির শীর্ষ নেতা মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজীব কুমারের সারদা কেলেঙ্কারির সময় ভূমিকা এবং ইডি-র তল্লাশির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্যের স্বীকৃতিস্বরূপই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানো হচ্ছে — যেন তিনি মুখ খোলেন না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *