ভারতের সবচেয়ে উচ্চতম রেল স্টেশন ‘ঘুম’ কিভাবে তৈরি হয়েছিল?

Spread the love

দার্জিলিং অঞ্চলে রেললাইন বসানোর ভাবনা প্রথম আসে ১৮ শতকের শেষের দিকে। ব্রিটিশরা পাহাড় অঞ্চলে চা-বাগান থেকে উৎপাদিত চা দ্রুত বাজারজাত করতে চেয়েছিলেন।

ভারতের রেল ইতিহাসে পাহাড়ি রেলপথ সবসময়ই এক বিস্ময়ের স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। সমতলের সরল পথে ট্রেন চালানো সহজ হলেও হিমালয়ের খাড়া ঢালে রেললাইন বসানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি, পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছিল, তার অন্যতম নিদর্শন হলো দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে এবং এর মধ্যে অবস্থিত ভারতের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন ঘুম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,৪০৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ছোট্ট স্টেশন কেবল প্রকৌশলের সাফল্য নয়, বরং ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবও প্রতিফলিত করে। ঘুম স্টেশন আজ শুধু একটি ট্রেন থামার জায়গা নয়, এটি ভারতের ঐতিহ্য এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

দার্জিলিং অঞ্চলে রেললাইন বসানোর ভাবনা প্রথম আসে ১৮ শতকের শেষের দিকে। ব্রিটিশরা পাহাড় অঞ্চলে চা-বাগান থেকে উৎপাদিত চা দ্রুত বাজারজাত করতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও সেনাদের পাহাড়ি অঞ্চলে দ্রুত পৌঁছানোর সুবিধা তৈরি করার জন্য রেলপথ অত্যন্ত জরুরি ছিল। সেই সময় ব্রিটিশরা দার্জিলিংকে হিল স্টেশন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করছিল। এই সব চাহিদার কারণে ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ফ্র্যাঙ্কলিন প্রেস্টেজ একটি সরু গেজের রেললাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেন। ১৮৭৯ সালে কাজ শুরু হয় এবং মাত্র দু’বছরের মধ্যে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত রেলপথ সম্পূর্ণ হয়।

পাহাড়ে রেললাইন বসানো সহজ ছিল না। বড় টানেল খোঁড়ার মতো প্রযুক্তি তখন ছিল না, তাই ইঞ্জিনিয়াররা নতুন কৌশল ব্যবহার করেন। সমতলের ট্রেন সহজে এগোতে পারলেও পাহাড়ে খাড়া ঢালে সরাসরি ওঠা সম্ভব নয়। ফলে বিশেষভাবে জিগ-জ্যাগ ট্র্যাক এবং লুপ ব্যবহার করে ট্রেন ধীরে ধীরে উচ্চতায় ওঠে। পাহাড়ের খাড়া বাঁক এবং ছোট ইঞ্জিনের ব্যবহারের মাধ্যমে এই পথ তৈরি করা সম্ভব হয়। এই কৌশলগুলো ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ১৮৮১ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে সম্পূর্ণ হয় এবং এর মধ্যে তৈরি হয় ঘুম স্টেশন।

ঘুম স্টেশন দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭,৪০৭ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই স্টেশন ভারতের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন হিসেবে পরিচিত। ঘুম স্টেশন তৈরি করতে শ্রমিকরা প্রচণ্ড শারীরিক কষ্ট সহ্য করেছেন। পাহাড় কেটে জায়গা তৈরি করা, ঠান্ডা আবহাওয়ায় কাজ চালানো এবং যন্ত্রপাতি পাহাড়ে ওঠানো— সবই ছিল চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এই শ্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠে এক অনন্য স্টেশন, যা থেকে খেলনা ট্রেন হিমালয়ের বুক চিরে চলে যায়।

ঘুম কেবল একটি স্টেশন নয়, এখানে রয়েছে একটি ছোট রেলওয়ে মিউজিয়াম। সেখানে রাখা আছে পুরনো স্টিম ইঞ্জিন, দার্জিলিং রেলওয়ের ঐতিহাসিক ছবি এবং নথি। এই জাদুঘর পর্যটকদের কাছে ভীষণ আকর্ষণীয়।

ব্রিটিশ আমলের সময় ঘুম স্টেশন এবং দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কেবল পর্যটনের জন্য তৈরি হয়নি। এর পিছনে ছিল চা-বাণিজ্য, সেনাদের দ্রুত যাতায়াত এবং পাহাড়ি অঞ্চলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। চা উৎপাদিত এলাকা থেকে বাজারে দ্রুত সরবরাহ করা, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সেনাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রদর্শন করা— এসব উদ্দেশ্য ছিল এই রেলপথ নির্মাণের মূল প্রেক্ষাপট।

বছরের পর বছর ধরে ঘুম স্টেশন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। দার্জিলিং ভ্রমণে খেলনা ট্রেনে ঘুম পর্যন্ত যাত্রা অভিজ্ঞতার অন্যতম অংশ। এই যাত্রায় পর্যটকরা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং ঘুম মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। বাতাসিয়া লুপের মাধ্যমে ট্রেন ঘুরে উপরের দিকে ওঠে, যা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

২০০০ সালে ইউনেস্কো দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান ঘোষণা করে। ঘুম স্টেশনও এই ঘোষণার অংশ হয়ে ওঠে। এটি ভারতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। আধুনিক সময়ে ভারতীয় রেলওয়ে ঘুম এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক রেললাইন সংরক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

ঘুম স্টেশন কেবল একটি ট্রেন থামার স্থান নয়। এটি ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং প্রকৌশল দক্ষতার এক প্রতীক। পাহাড় কেটে, প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে যে বিস্ময় তৈরি হয়েছিল, ঘুম তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ব্রিটিশ শাসনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে শুরু করে আজকের পর্যটনকেন্দ্র— ঘুম দীর্ঘ পথ পেরিয়েছে। ট্রেন যখন ধীরে ধীরে ঘুম স্টেশনে পৌঁছায়, তখন মনে হয় সময় যেন পিছিয়ে গেছে। ট্রেনের সিটি, পাহাড়ের কুয়াশা এবং পুরনো দিনের আবহ একসঙ্গে অতীত ও বর্তমানকে মিলিয়ে দেয়। ঘুম স্টেশন তাই শুধু ভ্রমণের অংশ নয়, এক অনন্য ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *