Durga Puja Economy: বাংলার উৎসবে ৪০ হাজার কোটির ব্যবসা, লক্ষাধিক কর্মসংস্থান! বাংলার অর্থনীতিকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখে দুর্গাপুজো?

Spread the love

বাংলার উৎসব মানেই আনন্দ, মিলন আর ঐতিহ্য। কিন্তু সব উৎসবের মধ্যে দুর্গাপুজো একেবারেই অনন্য। দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এখন একটি UNESCO Intangible Cultural Heritage of Humanity স্বীকৃত সাংস্কৃতিক সম্পদ। পাঁচ দিনের এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অগণিত মানুষের আবেগ, শিল্প, সাহিত্য, খাবার, পর্যটন—সবকিছু। তবে এর বাইরেও দুর্গাপুজো পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের ক্রিয়েটিভ ইকোনমি রাজ্যের মোট জিডিপির প্রায় ২.৫% অবদান রাখে। হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা এবং লক্ষাধিক কর্মসংস্থান তৈরি হয় এই কয়েক সপ্তাহে। শুধু উৎসব নয়, এটি আজ বাংলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।


Durga Puja Economy 2025 বাংলার অর্থনীতিতে এক বিরাট অবদান রাখছে। এবছর উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা ও লক্ষাধিক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

বাংলার অর্থনীতিতে দুর্গাপুজোর ভূমিকা অপরিসীম। উৎসব শুরু হওয়ার অন্তত দুই-তিন মাস আগে থেকেই বাজারে খরচ বাড়তে থাকে। নতুন জামাকাপড়, গয়না, ইলেকট্রনিক্স, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা জিনিস কেনাকাটায় মানুষ ব্যস্ত হয়ে ওঠেন।

  • রিটেল সেক্টরে ব্যবসা: শুধু রিটেল মার্কেটে পুজো উপলক্ষে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।
  • খাদ্য ও পানীয় খাত: ২০২৩ সালের তথ্য বলছে, শুধুমাত্র কলকাতার রেস্তোরাঁ ও বারে পুজোর কয়েকদিনেই আয় হয়েছিল ১১০০ কোটি টাকারও বেশি।
  • ফ্যাশন ও পোশাক শিল্প: জামাকাপড় ও গয়নার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যার মূল সুবিধাভোগী ছোট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় দোকানদাররা।

কর্মসংস্থান: গ্রামীণ থেকে শহরে

দুর্গাপুজোকে ঘিরে শুধু ব্যবসা নয়, তৈরি হয় প্রচুর অস্থায়ী কর্মসংস্থান।

  • শিল্পী ও কারিগর: কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করে কয়েক মাসের আয় নিশ্চিত করেন।
  • প্যান্ডেল শিল্পী: থিম পুজোর কারণে হাজার হাজার প্যান্ডেল শিল্পী কাজ পান।
  • টেকনিশিয়ান ও ইলেকট্রিশিয়ান: আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম, জেনারেটর—সব মিলিয়ে প্রচুর প্রযুক্তিগত শ্রমিক যুক্ত থাকেন।
  • ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রী: দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঢাকিরা এসে যোগ দেন, উৎসবের রঙে রঙিন করে তোলেন।
  • অস্থায়ী শ্রমিক: প্যান্ডেল নির্মাণ থেকে ভিড় সামলানো পর্যন্ত প্রায় ৩ লক্ষ অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয় দুর্গাপুজোর সময়ে।

এই কর্মসংস্থান অনেক গ্রামীণ পরিবারের সারা বছরের ভরসা হয়ে ওঠে।


পর্যটন খাতে বিপ্লব

২০২১ সালে UNESCO স্বীকৃতি পাওয়ার পর কলকাতার দুর্গাপুজো আন্তর্জাতিকভাবে আরও জনপ্রিয় হয়েছে।

  • দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটক আগমন: কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিদেশি পর্যটক ভিড় জমাচ্ছেন।
  • হোটেল ব্যবসা: দুর্গাপুজোর সময়ে হোটেল বুকিং প্রায় ফুল হয়ে যায়। ছোট গেস্টহাউস থেকে পাঁচতারা হোটেল—সবখানেই দারুণ রোজগার হয়।
  • এয়ারলাইনস ও পরিবহণ: বিমান সংস্থা, রেল, ট্যাক্সি ও অ্যাপ ক্যাবের ব্যবসাও এই সময়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
  • সংস্কৃতি পর্যটন: প্যান্ডেল হপিং, থিম পুজো, ঐতিহ্যবাহী বনেদি বাড়ির পুজো দেখতে দেশ-বিদেশের মানুষ ভিড় করেন।

ফলে দুর্গাপুজো শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটনেও বড় জায়গা তৈরি করেছে।


সৃজনশীল শিল্পের প্রসার

দুর্গাপুজো কেবল ব্যবসা বা পর্যটন নয়, এটি সৃজনশীল শিল্পকলা-রও এক বিশাল ক্ষেত্র।

  • থিম পুজো: প্রতিটি বড় পুজো কমিটি নতুন থিম নিয়ে আসে। শিল্পীরা মাসের পর মাস কাজ করেন।
  • আলোকসজ্জা: চন্দননগরের লাইটিং এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
  • সঙ্গীত ও নাটক: দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে প্রচুর গান, নাটক, শর্ট ফিল্ম তৈরি হয়।
  • বিজ্ঞাপন: প্যান্ডেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন শিল্পও কয়েকশো কোটি টাকার ব্যবসা করে।

ডিজিটাল যুগে দুর্গাপুজো

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি দুর্গাপুজোকে আরও বাণিজ্যিক করেছে।

  • লাইভ স্ট্রিমিং: অনেক পুজো এখন ইউটিউব, ফেসবুক বা অ্যাপে লাইভ দেখা যায়।
  • ই-কমার্স: পুজোর কেনাকাটার বড় অংশ অনলাইনে হচ্ছে।
  • ডিজিটাল ক্যাম্পেইন: ব্র্যান্ডগুলো এখন দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং চালাচ্ছে।

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

যদিও দুর্গাপুজো অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে, তবুও কিছু সমস্যা রয়েছে—

  • বাণিজ্যিকীকরণ: অনেক সময় সাংস্কৃতিক দিকটা চাপা পড়ে যায়।
  • অস্থায়ী কর্মসংস্থান: বেশিরভাগ কাজই স্বল্পমেয়াদী, স্থায়ী নয়।
  • ট্রাফিক ও দূষণ: বিপুল জনসমাগম শহরে পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি করে।

তবুও আর্থিকভাবে দুর্গাপুজোর প্রভাব বাংলার জন্য অমূল্য।

দুর্গাপুজোকে ঘিরে আজ আর্থিক প্রেক্ষাপট যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে উৎসবের চরিত্রও। আগে দুর্গাপুজো ছিল প্রধানত স্থানীয় কমিটি, পাড়ার মানুষের চাঁদা তোলার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন কর্পোরেট স্পনসরশিপ, ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশন এবং বিপুল বিজ্ঞাপনী ব্যয়ের কারণে দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক মঞ্চ।

এবারের উৎসবে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করেছে GST সংস্কার। করের হার কমার ফলে একদিকে যেমন কোম্পানিগুলোর ব্যয় করার ক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে গ্রাহকরাও পাচ্ছেন সস্তায় কেনাকাটার সুযোগ। এর ফলে কোম্পানিগুলো তাদের মার্কেটিং বাজেট বাড়িয়েছে প্রায় ১৫–২০ শতাংশ। সেঞ্চুরি প্লাই, ইমামি, ডাবর, এভাররেডি, ব্লু স্টার প্রভৃতি সংস্থা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে—এই পুজোয় তারা নতুন রেকর্ড গড়তে চায় বিক্রি ও গ্রাহকসংযোগের ক্ষেত্রে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, Durga Puja Economy 2025 কেবল খুচরো ব্যবসা নয়, বরং কর্পোরেট স্পনসরশিপ, পর্যটন ও GST সংস্কারের প্রভাবেও শক্তিশালী হয়েছে।

কর্পোরেট স্পনসরশিপ এখন দুর্গাপুজোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বড় পুজো কমিটিগুলি কোটি টাকার বাজেট নিয়ে কাজ করছে। নতুন প্যান্ডেল ডিজাইন, লাইটিং, থিম, প্রচার—সব ক্ষেত্রেই এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন শিল্পীরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি কোম্পানিগুলোও তাদের ব্র্যান্ডকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন।

ইমামির এক মুখপাত্র যেমন বলেছেন, “দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের সময়। এই সময় গ্রাহকদের সঙ্গে আবেগী যোগ তৈরি হয়।” এভাররেডি ইন্ডাস্ট্রিজ-এর CEO অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, “দুর্গাপুজো আমাদের কোম্পানির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই মার্কেটিং বাজেটের বড় অংশ বরাদ্দ হয় এই উৎসবকে ঘিরে।”

খুচরো বাজার ও ভোক্তাদের উচ্ছ্বাস

কর হ্রাসের ফলে এ বছর কেনাকাটার হিড়িক পড়েছে। ব্লু স্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর বি. থিয়াগারাজন জানিয়েছেন, কর কমায় বিক্রি অন্তত ২৫ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা। ভোক্তাদের এই চাহিদা বৃদ্ধিই প্রমাণ করছে, দুর্গাপুজো এখন শুধু আধ্যাত্মিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়—এটি এক বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি।

বস্ত্র, গয়না, ইলেকট্রনিক্স, আসবাব, এমনকি গৃহস্থালি সামগ্রী—সব ক্ষেত্রেই বিক্রির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। দোকানপাট, মল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গাতেই ব্যবসা বাড়ছে।

কর্মসংস্থান ও শিল্পচর্চা

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় অবদান কর্মসংস্থানে। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা কয়েক মাস ধরে প্রতিমা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্যান্ডেল শিল্পী, আলোকসজ্জা কর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান, ঢাকি, সাউন্ড টেকনিশিয়ান—প্রায় তিন লক্ষ অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয় শুধু এই সময়েই।

এছাড়া থিম পুজোর মাধ্যমে অসংখ্য শিল্পী তাঁদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পান। প্যান্ডেল ডিজাইন, আর্ট ইনস্টলেশন, মঞ্চসজ্জা—সবই এক বিশাল সৃজনশীল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। ফলে দুর্গাপুজো বাংলার সংস্কৃতিকে যেমন সমৃদ্ধ করছে, তেমনি অর্থনীতিতেও জোগাচ্ছে নতুন প্রাণশক্তি।

পর্যটনের জোয়ার

ইউনেস্কো স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে কলকাতার দুর্গাপুজো আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা এসে ভিড় জমাচ্ছেন। এর ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিমান সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সি, স্থানীয় পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই ব্যবসা বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। পর্যটন এখন দুর্গাপুজো অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক

দুর্গাপুজোর তাৎপর্য কেবল টাকাপয়সার অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাঙালির সামাজিক মিলনেরও প্রতীক। পাড়া-মহল্লা একত্রিত হয়, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মিশে যান আনন্দে। ঢাকের তালে, আলোর ঝলকে, দেবীর আগমনে তৈরি হয় এক আধ্যাত্মিক আবহ, যা মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, Durga Puja Economy 2025 এখন আর শুধুই উৎসব নয়, বরং বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম স্তম্ভ।

দুর্গাপুজো তাই এক বহুমাত্রিক শক্তি—সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক চালক এবং সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। কর্পোরেট খরচের বৃদ্ধি, GST সংস্কারের ইতিবাচক প্রভাব, ভোক্তাদের ব্যয়বৃদ্ধি, বিপুল কর্মসংস্থান ও পর্যটনের স্রোত—সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো এখন বাংলার অর্থনীতির হৃদস্পন্দন।

একদিকে যেমন প্রতিমার চোখে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, অন্যদিকে হাজার হাজার পরিবারের জীবনে জ্বলে ওঠে নতুন আশার আলো। বাংলার মানুষ জানেন—মা দুর্গার আগমন মানেই শুধু আনন্দ নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক ঐক্যেরও প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *