গত কয়েক বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে এক অভাবনীয় বিপ্লব এসেছে। এক সময় যেখানে দেশটি বিশ্ববাজার থেকে অস্ত্র কিনে নিজেকে রক্ষা করত, আজ সেই ভারত নিজেই শক্তিশালী অস্ত্র বানিয়ে বিশ্বের বহু দেশের নজর কাড়ছে। এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থাগুলোর নিরলস পরিশ্রম এবং সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির কার্যকর প্রয়োগ। বর্তমানে ভারতের তৈরি কিছু অস্ত্র এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু দেশের নিরাপত্তা নয়, বরং বৈদেশিক সম্পর্ক ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বহু শক্তিধর দেশ এই অস্ত্রগুলি পেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, যা ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মানের স্পষ্ট স্বীকৃতি।
এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হল BrahMos মিসাইল, যা ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি। এটি পৃথিবীর দ্রুততম সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল হিসেবে পরিচিত। অতি উচ্চ গতি, নির্ভুলতা এবং বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এই মিসাইল বিভিন্ন দেশ যেমন ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, আরব আমিরশাহী এবং আর্জেন্টিনার আগ্রহ অর্জন করেছে। এই মিসাইল স্থল, জাহাজ ও যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপ করা যায়, যা যেকোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতকে বড়সড় সুবিধা প্রদান করে।
তুলনামূলকভাবে কম খরচে উচ্চ কার্যকারিতাসম্পন্ন আরেকটি ভারতীয় অস্ত্র হল আকাশ মিসাইল সিস্টেম। এটি একটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল, যা শত্রুর যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং মিসাইল ধ্বংসে পারদর্শী। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং আর্মেনিয়া এই মিসাইল ব্যবস্থায় গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি যে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি কার্যকর ‘শিল্ড’ হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।
ভারতের অস্ত্রশক্তি বিশ্বমঞ্চে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ভারতের তৈরি Tejas হালকা যুদ্ধবিমানও আজ আন্তর্জাতিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই মাল্টিরোল ফাইটার জেটের মধ্যে আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা এবং উচ্চতর কৌশলগত দক্ষতা রয়েছে। মিশর ও আর্জেন্টিনা এই যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা শুরু করেছে, এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার অন্য কিছু দেশও এই বিমানে আগ্রহী। ভারতের বিমান শিল্পের ক্ষেত্রে এটি এক বড় মাইলফলক।
ভারতের উন্নত রকেট আর্টিলারি Pinaka যুদ্ধক্ষেত্রে এক বিশেষ অস্ত্র। একসাথে বহু রকেট নিক্ষেপ করে বিরাট এলাকায় ধ্বংস ডেকে আনার ক্ষমতা এই সিস্টেমকে আধুনিক যুদ্ধনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আর্মেনিয়া ইতিমধ্যেই এই অস্ত্র সিস্টেমের কিছু ইউনিট কিনেছে এবং আরও কিছু দেশ তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় এটি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
Rustom সিরিজের UAV বা ড্রোন ভারতের স্বনির্ভরতার আরেকটি দৃষ্টান্ত। নজরদারি, রিকনিসেন্স, সীমানা পর্যবেক্ষণ এবং সামরিক তথ্য সংগ্রহে এই ড্রোনগুলো অতি কার্যকর। দীর্ঘ সময় আকাশে থেকে নজরদারি চালাতে পারে বলেই মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশসহ আফ্রিকার কয়েকটি রাষ্ট্র এই ড্রোনে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ভারতের তৈরি উন্নত কামান ATAGS সামরিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এটি আধুনিক ক্যালিবারের একটি হাউইটজার, যা তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম এবং একাধিক উন্নত ফায়ার কন্ট্রোল ফিচারে সমৃদ্ধ। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এটিকে তাদের সেনাবাহিনীর অংশ করতে চাচ্ছে।
Swathi রাডার সিস্টেমও ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণার এক অনন্য সাফল্য। শত্রু পক্ষের মর্টার, রকেট বা আর্টিলারির উৎস চিহ্নিত করতে সক্ষম এই রাডার ইতিমধ্যেই আর্মেনিয়ার হাতে পৌঁছে গেছে এবং আরও দেশ এর প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
Dhanush হাউইটজার কামান ভারতীয় সেনার নিজস্ব উন্নয়ন হলেও এর ভিত্তি রয়েছে Bofors প্রযুক্তির ওপর। তবে এর কার্যক্ষমতা অনেকটাই উন্নত করা হয়েছে। দীর্ঘ পাল্লা এবং নির্ভুল লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা এটিকে বহির্বিশ্বের নজরে এনেছে।

Dhruv হেলিকপ্টার, যা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড তৈরি করেছে, বহু দেশেই প্রশংসিত হয়েছে। এটি বহু উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, যেমন—মেডিকেল ইভাকুয়েশন, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ, নজরদারি ও সেনা পরিবহণ। ইকুয়েডর এবং নেপালসহ একাধিক দেশ এই হেলিকপ্টার ব্যবহারে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছে।
ভারতের তৈরি স্মার্ট বোমা SAAW, যা শত্রুপক্ষের রানওয়ে বা বিমানঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এটি বিভিন্ন যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া যায় এবং GPS ও ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়। অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি উন্নত দেশ এর কার্যক্ষমতা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।