এক ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখলে কী হয়? জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ

Spread the love

ব্যস্ত অফিস, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, পরীক্ষা কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণের সময় অনেকেই প্রস্রাবের তাগিদ অনুভব করেও সঙ্গে সঙ্গে টয়লেটে যেতে পারেন না। বাধ্য হয়ে কিছু সময় প্রস্রাব চেপে রাখতে হয়। এক-দু’বার এমন ঘটলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে—এক ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখলে শরীরে কী ঘটে? এতে কি ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা UTI হতে পারে? কিডনি কিংবা মূত্রথলির কোনও স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি?

চিকিৎসকদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জরুরি পরিস্থিতিতে এক ঘণ্টা প্রস্রাব ধরে রাখলে সাধারণত বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয় না। তবে বিষয়টি নির্ভর করে মূত্রথলি কতটা ভর্তি ছিল, ওই ব্যক্তি কতটা জল পান করেছেন এবং তাঁর আগে থেকে কোনও মূত্রনালি, কিডনি বা স্নায়ুজনিত সমস্যা রয়েছে কি না—তার ওপর। তাই শুধু সময়ের হিসাব দিয়ে ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না।

প্রস্রাবের তাগিদ কেন অনুভূত হয়?

কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত জল ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। ইউরেটার নামের দুটি নালির মাধ্যমে সেই প্রস্রাব মূত্রথলিতে জমা হয়। মূত্রথলি ধীরে ধীরে ভর্তি হতে থাকলে তার দেয়ালে থাকা স্নায়ু মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। তখনই আমরা প্রস্রাবের তাগিদ অনুভব করি।

প্রথমবার তাগিদ অনুভূত হওয়ার অর্থ এই নয় যে মূত্রথলি আর এক ফোঁটাও প্রস্রাব ধারণ করতে পারবে না। সুস্থ মূত্রথলি কিছুটা প্রসারিত হয়ে আরও প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে। তবে তাগিদ উপেক্ষা করতে থাকলে চাপ ও অস্বস্তি ক্রমশ বাড়তে থাকে।

এক ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখলে কী হতে পারে?

সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক ঘণ্টা প্রস্রাব আটকে রাখলে সাধারণত সাময়িক কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হলো তলপেটে চাপ বা ভারী অনুভূতি। কারও কারও হালকা ব্যথা, অস্থিরতা, ঘাম, মনোযোগে সমস্যা কিংবা বারবার টয়লেটের কথা মনে হতে পারে।

মূত্রথলি বেশি ভর্তি হলে প্রস্রাবের তাগিদ অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠতে পারে। হাঁটা, কাশি, হাঁচি বা শরীরের অবস্থান পরিবর্তনের সময় সামান্য প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। টয়লেটে পৌঁছানোর পর প্রস্রাব শুরু করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে অথবা খুব দ্রুত প্রস্রাব বের হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূত্রথলি খালি হওয়ার পর এই অস্বস্তি কমে যায়।

তবে এক ঘণ্টা ধরে রাখার আগেই যদি মূত্রথলি প্রায় সম্পূর্ণ ভর্তি থাকে, তাহলে অস্বস্তি অনেক বেশি হতে পারে। আবার কম জল পান করা অবস্থায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করলে কোনও লক্ষণই নাও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ ঝুঁকি শুধু কতক্ষণ ধরে রাখা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়।

মূত্রথলিতে কতটা প্রস্রাব জমতে পারে?

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মূত্রথলি সাধারণভাবে কয়েকশো মিলিলিটার প্রস্রাব ধারণ করতে পারে। তবে এর নির্দিষ্ট পরিমাণ বয়স, শারীরিক গঠন, ওষুধ, জলপানের মাত্রা এবং মূত্রথলির স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। সবার মূত্রথলির ধারণক্ষমতা এক নয়।

এই কারণে অন্য কারও টয়লেটে যাওয়ার ব্যবধান দেখে নিজের অভ্যাস নির্ধারণ করা উচিত নয়। তাগিদ অনুভব করার পর শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

এক ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখলে কি UTI হয়?

মাত্র একবার এক ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখলেই UTI হবে—এমন কোনও সরল নিয়ম নেই। মূত্রনালীর সংক্রমণ সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। তবে নিয়মিত দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখা এবং মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি না হওয়ার সমস্যা থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মূত্রথলিতে অবশিষ্ট প্রস্রাব থাকলে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

UTI হলে প্রস্রাবের সময় জ্বালা, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, অল্প পরিমাণ প্রস্রাব, তলপেটে ব্যথা, প্রস্রাবে দুর্গন্ধ বা রক্ত দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ কিডনিতে পৌঁছালে জ্বর, কাঁপুনি, বমিভাব এবং পিঠের এক পাশে ব্যথা হতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

নিয়মিত প্রস্রাব চেপে রাখার ক্ষতি কী?

কখনও জরুরি কারণে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা এবং প্রতিদিন দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখা এক বিষয় নয়। বারবার তাগিদ উপেক্ষা করলে মূত্রথলি অতিরিক্ত প্রসারিত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে মূত্রথলির স্বাভাবিক সংকেত বোঝার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে এবং সম্পূর্ণ প্রস্রাব বের করতে অসুবিধা হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী প্রস্রাব আটকে থাকার সমস্যাকে ইউরিনারি রিটেনশন বলা হয়। এতে প্রস্রাব করার পরও মূত্রথলিতে কিছু প্রস্রাব থেকে যেতে পারে। এর ফলে বারবার সংক্রমণ, প্রস্রাব ঝরে পড়া, তলপেটে অস্বস্তি এবং কিছু ক্ষেত্রে মূত্রথলিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী রিটেনশন কিংবা মূত্রপথে বাধা থাকলে মূত্রথলির চাপ ওপরের দিকে গিয়ে কিডনির ক্ষতি করতে পারে। তবে সাধারণভাবে একবার এক ঘণ্টা প্রস্রাব ধরে রাখলেই কিডনি নষ্ট হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?

সব মানুষের জন্য প্রস্রাব ধরে রাখার ঝুঁকি সমান নয়। যাঁদের ডায়াবেটিস, প্রস্টেটের সমস্যা, কিডনির রোগ, বারবার UTI, মূত্রথলিতে পাথর বা স্নায়ুজনিত মূত্রথলির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

মেরুদণ্ডে আঘাত, স্ট্রোক, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা অন্য স্নায়ুজনিত সমস্যায় মূত্রথলি ভর্তি হওয়ার স্বাভাবিক সংকেত দুর্বল হতে পারে। তাঁদের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের তাগিদ না থাকলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মূত্রথলি খালি করার প্রয়োজন হতে পারে। ক্যাথেটার ব্যবহারকারীদেরও চিকিৎসকের দেওয়া নিয়ম মেনে চলা উচিত।

গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখা এড়িয়ে চলা ভালো। শিশু যদি নিয়মিত খেলাধুলা বা স্কুলের ভয়ে প্রস্রাব চেপে রাখে, তাহলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

কতক্ষণ অন্তর প্রস্রাব করা স্বাভাবিক?

কতক্ষণ অন্তর টয়লেটে যেতে হবে, তার কোনও একক নিয়ম নেই। জলপানের পরিমাণ, আবহাওয়া, ঘাম, চা-কফি, কিছু ওষুধ এবং শারীরিক অবস্থার কারণে প্রস্রাবের পরিমাণ বদলে যায়। তাই নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা না করে শরীরের স্বাভাবিক তাগিদ অনুযায়ী টয়লেট ব্যবহার করাই ভালো।

আবার প্রস্রাব হবে ভেবে প্রয়োজনের তুলনায় কম জল পান করাও ঠিক নয়। এতে শরীরে জলশূন্যতা, গাঢ় প্রস্রাব এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা হতে পারে। তৃষ্ণা ও চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করুন। কিডনি বা হৃদ্‌রোগের কারণে তরল নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ থাকলে সেটিই অনুসরণ করতে হবে।

নিরাপদ মূত্রথলি অভ্যাস কী?

প্রস্রাবের তাগিদ অনুভব করলে সম্ভব হলে দ্রুত টয়লেটে যান। অফিস বা ভ্রমণে বের হওয়ার আগে টয়লেট ব্যবহার করুন এবং পথে কোথায় টয়লেট পাওয়া যাবে, তা জেনে রাখুন। প্রস্রাব করার সময় তাড়াহুড়ো না করে মূত্রথলি খালি করার চেষ্টা করুন।

প্রস্রাব করার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, নিয়মিত তাগিদ উপেক্ষা করা কিংবা শুধু সুবিধার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে রাখা উচিত নয়। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং যৌনমিলনের পর প্রস্রাব করা কিছু মানুষের UTI ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে বারবার সংক্রমণ হলে ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসা প্রয়োজন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

প্রস্রাবের তীব্র চাপ ও তলপেট ফুলে থাকা সত্ত্বেও একেবারেই প্রস্রাব করতে না পারলে এটি জরুরি অবস্থা হতে পারে। দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। একইভাবে প্রস্রাবে রক্ত, তীব্র জ্বালা, জ্বর, কাঁপুনি, বমি, পিঠের পাশে ব্যথা কিংবা তীব্র তলপেটের ব্যথা হলে দেরি করা উচিত নয়।

স্বাভাবিকের তুলনায় খুব ঘন ঘন প্রস্রাব, রাতে বারবার টয়লেটে যাওয়া, প্রস্রাবের গতি দুর্বল হওয়া, ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব পড়া অথবা প্রস্রাব করার পরও মূত্রথলি ভর্তি মনে হলে ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।


জরুরি পরিস্থিতিতে একজন সুস্থ ব্যক্তি এক ঘণ্টা প্রস্রাব চেপে রাখলে সাধারণত বড় কোনও ক্ষতি হয় না। কিন্তু তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি সহ্য করে প্রস্রাব আটকে রাখা নিরাপদ অভ্যাস নয়। বিশেষ করে নিয়মিত দীর্ঘ সময় প্রস্রাব ধরে রাখলে মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি না হওয়া, UTI এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

শরীর প্রস্রাবের তাগিদের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়। তাই সুযোগ পেলেই টয়লেট ব্যবহার করুন, পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং অস্বাভাবিক কোনও উপসর্গ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য; ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।

Read More: Is Drinking Milk Tea on an Empty Stomach Harmful? Experts Explain

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *