কলকাতা: মমতাকে হারাবেন— এই ঘোষণা করেই ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ালেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির উত্তাপ দিনকে দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দিল্লি থেকে রাজ্য পর্যন্ত রাজনৈতিক কৌশল আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার হটস্পটে পরিণত হয়েছে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র। তৃণমূল সুপ্রিমো ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিরুদ্ধে এবার অন্যরকম দাবি করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ভবানীপুরে যদি দল কোন প্রার্থী দাঁড় করায়, তাতে মমতাকে হারানো হবে — এবং সেই দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধেই নেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবানীপুর কেন্দ্রের গুরুত্ব শুধু একটি বিধানসভা আসন নয়; উত্তর থেকে দক্ষিণ, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত রাজ্যের রাজনৈতিক আবহের প্রতিচ্ছবি। এই কেন্দ্রের ফলাফলে সম্ভব রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রের হালও বদলে যেতে পারে।
শুভেন্দু অধিকারীর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন রাজ্যের রাজনৈতিক মঞ্চে বড় বড় ইশারা, পাল্টা ইশারা এবং জটিল কূটকৌশল ঘিরে আছে। তিনি নিজে দাবি করেছেন, “আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ভবানীপুরে আমাদের প্রার্থী যদি লড়াই করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো সম্ভব হবে এবং আমি সে দায়িত্ব নিচ্ছি।” এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুভেন্দু যেন নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য আরও বেশি জোরালো করে তুলেছেন।
ভবানীপুর: প্রতিদ্বন্দ্বিতার কঠিন লড়াই
ভবানীপুর আসন তৃণমূল ঘরোনা বহু বছর ধরে। এই কেন্দ্র থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। এখানে তিনি প্রায় পরাজয়হীন অবস্থানে রয়েছেন। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হওয়া শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থান নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন সেই একই দ্বন্দ্বের মঞ্চে ভবানীপুরকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক যুদ্ধের ইঙ্গিত মিলছে।
শুভেন্দু গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এই কেন্দ্রটি রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের আখ্যান বদলাবে। যদি বিজেপি আমাকে এই দায়িত্ব দেয়, আমি ভবানীপুরে মমতাকে পরাজিত করব।” তাঁর বক্তব্যের সাথে রাজনৈতিক সমর্থক ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়াও আসে সঙ্গে সঙ্গে।
তৃণমূলের এক প্রভাবশালী নেতা জানান, “ভবানীপুর যেমন আমাদের কাছে আত্মবিশ্বাসের আসন, তেমনই এটা আমাদের সংগ্রামের প্রতীক। শুভেন্দুর এই মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, একটা কৌশলগত ইঙ্গিত।”
ভোটার তালিকা ও SIR বিতর্ক: তর্কের নতুন বুনোট
নির্বাচনী সভা, প্রচারণার সভা কিংবা জনসভায় এই রাজনৈতিক উত্তেজনা যতই বাড়ুক, এর পেছনে একটি বাস্তব কারণ রাজ্যের SIR (Special Intensive Revision) ভোটার তালিকা প্রক্রিয়া, যেখানে ভবানীপুরের হাজার হাজার নাগরিকের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং বিরোধীরা এটিকে ভোটার হ্রাস বা ভোটব্যবস্থার অপব্যবহার হিসেবে তুলে ধরছে।
ভোটারদের কিছু অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এই পরিবর্তনের ফলে জনমত ও ভোট কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে, যা ভবিষ্যতের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। তৃণমূলের এক কর্মী বলেন, “আমরা মনে করি এটি একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা, যাতে আমাদের ভোটার দল বিভ্রান্ত হয়।”
এদিকে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, “যা সত্য তা জনসাধারণের সামনে নিয়ে আসা চাই। ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেই ষড়যন্ত্র মানুষ বুঝবে ও প্রতিক্রিয়া দেবে।”
রাজনৈতিক গতি এবং ভবিষ্যতের চিত্র
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবানীপুর আসনটি শুধু একটি কেন্দ্র নয়। এটি একটি প্রতীক্ষার জায়গা — যেখানে ভোটাররা শুধু নেতাদের ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়, সামাজিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং ভোট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা — সবকিছু বিবেচনায় রাখেন। এই আসনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা— উভয়েরই নৈতিক ও কৌশলগতভাবে শক্ত অবস্থান রয়েছে।
রাজ্য রাজনীতিতে ভোটারদের মনোজাগরণ, জনসমর্থন ও আধুনিক রাজনৈতিক চিত্রের আলোকে ভবানীপুর আবার এক কঠিন লড়াইয়ের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, পরিকল্পনা বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই নির্ধারণ করবে না ফলাফল; বরং ভোটারদের বাস্তব জীবন, বিশ্বাস এবং ভোট ব্যবস্থার শুদ্ধতা — এই তিনটি মিলেই আগামী দিনের ছবি গড়ে উঠবে।
দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিক্রিয়া
শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণার পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন রূপে। তৃণমূলের তরফে এক প্রতিনিধি বলেছেন, “আমরা নির্বাচন সুন্দরভাবে করব এবং জনগণই সিদ্ধান্ত দেবে। আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক, কিন্তু মমताको প্রতি মানুষের ভালোবাসা স্থায়ী।”
অন্যদিকে বিজেপির কর্মী ও সমর্থকরা মনে করছেন, শুভেন্দুর উদ্যোগ ও দাবি ভবানীপুরকে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছে এবং এর ফলে মানুষের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Source & Reference)
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য, বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট, প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিবৃতি এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে তৈরি। পাঠকের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য নিচে প্রধান সূত্রগুলি উল্লেখ করা হল—
- News18 বাংলা
– ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য সংক্রান্ত মূল সংবাদ ও রাজনৈতিক রিপোর্ট।
– প্রতিবেদনে উল্লেখিত মন্তব্য ও সময়কাল এই সংবাদসূত্রের উপর ভিত্তি করে। - Anandabazar Patrika
– পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিধানসভা কেন্দ্রগুলির গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও লেখনশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত তথ্যভিত্তিক রেফারেন্স। - Election Commission of India
– ভোটার তালিকা সংশোধন (Special Intensive Revision – SIR) সংক্রান্ত নিয়ম, প্রক্রিয়া ও নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য। - The Print
– পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন। - সংবাদ সম্মেলন ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য
– বিভিন্ন জনসভা, সাংবাদিক সম্মেলন ও প্রকাশ্য বক্তৃতায় দেওয়া রাজনৈতিক মন্তব্য, যা একাধিক সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণরূপে তথ্যভিত্তিক ও সংবাদ বিশ্লেষণমূলক। এখানে প্রকাশিত মতামত কোনও ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার নয়। সমস্ত তথ্য নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র ও প্রকাশ্য বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত।