দক্ষিণ আফ্রিকা কি আমন্ত্রণ ছাড়াই G20–তে থাকতে পারে? আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে বড় প্রশ্ন

Spread the love

South Africa G20 বিতর্ক এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন তুলেছে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের G20 শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এখন বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা, গ্লোবাল সাউথের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত G20 সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না। এই ঘোষণা প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, যিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে G20 কোনো ব্যক্তিগত আমন্ত্রণনির্ভর অনুষ্ঠান নয় এবং সদস্যপদ প্রত্যাহারের ক্ষমতা কোনো এক দেশের হাতে নেই।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের জোহানেসবার্গ G20 সম্মেলনের পরপরই। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে যে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের আচরণ এবং সম্মেলন শেষে প্রেসিডেন্সি হস্তান্তরের পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্সি হস্তান্তরের সময় ‘যথাযথ প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়নি’, যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেই অভিহিত করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরপর ঘোষণা দেন যে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত G20 সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ‘আমন্ত্রণ না জানানো’ হবে। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অভিযোগ করেন যে সে দেশে শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়েছে। ট্রাম্প বলেন, “যে দেশ মানবাধিকারের প্রশ্নে ব্যর্থ, তাকে সম্মেলনে ডেকে আনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি ছিল একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক মন্তব্য। কারণ G20 হলো একটি স্থায়ী সদস্যভিত্তিক বহুপাক্ষিক ফোরাম, যেখানে সদস্যদের অংশগ্রহণ কোনো দেশের ইচ্ছা বা অনীহার ওপর নির্ভর করে না। প্রেসিডেন্ট রামাফোসা দ্রুত এই মন্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন যে দক্ষিণ আফ্রিকা G20–র একজন প্রতিষ্ঠিত এবং স্থায়ী সদস্য, যা কোনো সরকারের পরিবর্তন বা রাজনৈতিক মতভেদের কারণে বাদ যেতে পারে না। রামাফোসার ভাষায়, “G20 কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর এক যৌথ মঞ্চ, যেখানে সদস্যপদ একটি স্থায়ী স্বীকৃতি। আমন্ত্রণ প্রত্যাহারের ক্ষমতা কোনো একক দেশ বা কোনো একক নেতার নেই।”

রামাফোসার মন্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ G20–র কাঠামো এমনভাবে তৈরি, যেখানে সদস্যপদ স্থায়ী এবং বহুপাক্ষিক নীতিই মুখ্য। এ ধরনের ফোরামে অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক চাপ বা কোনো এক দেশের একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রভাবিত করা যায় না। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের মন্তব্য শুধুমাত্র কূটনৈতিক নিয়ম ভঙ্গ করা নয়, বরং বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার জন্যও একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।

দক্ষিণ আফ্রিকা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে তারা ২০২৬ সালের সম্মেলনে অংশ নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সির অধীনেও তাদের অংশগ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। দক্ষিণ আফ্রিকা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে আফ্রিকা মহাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা তাদের দায়িত্ব, এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে G20–র কার্যক্রমে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। তারা আরও জানিয়েছে যে বহুপাক্ষিক নীতি অনুযায়ী একতরফাভাবে কোনো সদস্যকে আমন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত করা যায় না, এবং G20–র ইতিহাসে এমন কোনো নজিরও নেই।

এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বড় প্রশ্ন তুলেছে—বহুপাক্ষিক ফোরামগুলো কি সত্যিই নিরপেক্ষ? নাকি সেখানে এখনো শক্তিধর দেশের রাজনৈতিক প্রভাবই বেশি কার্যকর? অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য G20–র মতো গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষত, যদি কোনো দেশের রাজনৈতিক মতভেদের কারণে অন্য সদস্যকে বর্জিত করার চেষ্টা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

গ্লোবাল সাউথের ক্ষেত্রেও এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ বহুদিন ধরে বহুপাক্ষিক ফোরামে সমান মর্যাদা দাবি করে আসছে। তারা মনে করে যে বিশ্ব রাজনীতি কেবলমাত্র পশ্চিমা বা শক্তিধর দেশের নির্দেশে চলতে পারে না। দক্ষিণ আফ্রিকার দৃঢ় অবস্থান সেই আন্দোলনকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। রামাফোসার বক্তব্য অনেক দেশের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা—গ্লোবাল সাউথ আর আগের মতো নীরব দর্শক হতে চায় না; তারা এখন নিজেদের অধিকারের জন্য দৃঢ় অবস্থান নেবে।

ভারতের ক্ষেত্রেও ঘটনাটি নজরকাড়া। ভারত বহুদিন ধরেই গ্লোবাল সাউথের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। ২০২৩ সালে ভারত যখন G20 সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছিল, তখনই তারা ‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’, ‘সমান অংশগ্রহণ’, ‘গ্লোবাল সাউথের উদ্বেগ’ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সামনে এনেছিল। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ গ্লোবাল সাউথের ভবিষ্যৎ সমন্বয় এবং যৌথ অবস্থানের দিক থেকে একটি বড় সতর্ক সংকেত। ভারতের অনেক কূটনীতিক জানিয়েছেন, বহুপাক্ষিক ফোরামে রাজনৈতিক চাপ বা একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ট্রাম্পের মন্তব্য কিছুটা বিতর্ক তৈরি করেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রকে নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থানেই দুর্বল করবে। কারণ G20 শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্র নয়—এটি জলবায়ু, উন্নয়ন, বৈশ্বিক নীতি, মানবাধিকারসহ বহু গুরুতর ইস্যুর আলোচনাস্থল। সেখানে সদস্যকে বাদ দেওয়া বা আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করা কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায়, সমাধান আনে না।

২০২৬ মিয়ামি G20 সম্মেলন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ও কূটনৈতিক উত্তেজনা

অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বা মন্তব্য ভবিষ্যতে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আফ্রিকান ও এশীয় দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। তারা মনে করছে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। ফলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আগামী দিনে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য নতুন জোট বা বিকল্প ফোরাম গড়ে তুলতেই পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকা এই অবস্থায়ও স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা G20–র প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের মতে, G20 একটি সমান মর্যাদার প্ল্যাটফর্ম এবং তারা নিজেদের ভূমিকায় অবিচল থাকবে। দক্ষিণ আফ্রিকা আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ২০২৫ সালের জোহানেসবার্গ G20 সম্মেলনও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যদিও সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা মনে করে যে এই ফোরামে তাদের ভূমিকা ইতিহাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং তা আন্তর্জাতিক নীতি কাঠামোর অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি একটি নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব এখন এমন এক পর্বে এসেছে, যেখানে শক্তিধর দেশগুলির একতরফা সিদ্ধান্ত আগের মতো সহজে কার্যকর করা সম্ভব নয়। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন আগের থেকে অনেক বেশি আওয়াজ তুলতে সক্ষম, এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। দক্ষিণ আফ্রিকার দৃঢ় অবস্থান সেই বৃহত্তর রূপান্তরেরই প্রতিচ্ছবি।

এই বিতর্ক দীর্ঘমেয়াদে G20–র ভবিষ্যৎ কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে। যদি সদস্যপদ এবং অংশগ্রহণ নিয়ে এমন বিভ্রান্তি বা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে G20–কে তার নীতি, প্রক্রিয়া এবং পরিচালন কাঠামো আরও সুসংহত করতে হবে। অন্যথায়, বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম দুর্বল হয়ে পরতে পারে।

সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, ট্রাম্পের মন্তব্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার গুরুত্ব আবার সামনে এসেছে। রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সহযোগিতা, সমান মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে G20–র মতো ফোরামকে রাজনৈতিক প্রভাবে নয়, বরং স্থায়ী নীতিগত মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে চলতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান এই দিকেই বিশ্বকে সতর্ক করে দিল—যে বহুপাক্ষিক ফোরাম কোনোভাবেই একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের খেলা হতে পারে না।

Relations


Sources & References:

  1. Reuters – Trump says South Africa won’t receive invitation to 2026 G20 Summit
    https://www.reuters.com/world/africa/trump-says-south-africa-wont-receive-invitation-g20-2026-2025-11-26/
  2. The Guardian – South Africa hits back at Trump move to bar it from 2026 G20 meeting
    https://www.theguardian.com/world/2025/nov/27/south-africa-hits-back-trump-move-g20-meeting-florida-2026
  3. Al Jazeera – Can Trump ban South Africa from 2026 G20 summit?
    https://www.aljazeera.com/news/2025/11/27/can-trump-ban-south-africa-from-2026-g20-summit-as-he-says-he-will
  4. China Daily – Ramaphosa dismisses US move to exclude South Africa from G20 Summit
    https://www.chinadaily.com.cn/a/202511/27/WS69280f2aa310d6866eb2bbd4.html
  5. News24 – Why Trump can’t actually kick South Africa out of the G20
    https://www.news24.com/opinions/explainers/explainer-why-trump-cant-actually-kick-sa-out-of-the-g20-20251127-0828
  6. Chatham House – South Africa’s G20 role and challenges in a fractious world
    https://www.chathamhouse.org/2025/11/south-africas-g20-presidency-demonstrates-challenge-inclusion-fractious-world

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *