বিহারের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০ নভেম্বর ২০২৫ একটি বিশেষ দিন হয়ে থাকবে। সেদিন পাটনার গাঁধী ময়দানে নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দশমবার। ভারতের গণতন্ত্রে কোনো মুখ্যমন্ত্রীর এত দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থায়িত্ব খুব কমই দেখা গেছে। প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক ওঠাপড়া, জোটবদল, বিরোধী চাপ ও অবিরাম প্রশ্নবাণ—সবকিছুকে অতিক্রম করেই এই রেকর্ড তিনি গড়ে তুলেছেন।
কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই দীর্ঘ পথচলা?
কোন কোন অজানা অধ্যায় তৈরি করেছে নীতিশ কুমারকে এমন একটি অবস্থানে, যেখানে তিনি একাই বিহারের রাজনীতিকে বহু বছর ধরে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন?
এই প্রতিবেদনে সেই বিষয়গুলোই বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা: সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসার গল্প
১৯৫১ সালের ১ মার্চ বিহারের বখতিয়ারপুরে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন নীতিশ কুমার। বাবা কবরাজ রাম লখন সিংহ ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক, মা পারমেশ্বরী দেবী ছিলেন গৃহিণী। শৈশবে আর পাঁচজন সাধারণ পরিবারের সন্তানের মতোই সাদামাটা পরিবেশেই বড় হয়েছেন তিনি।
স্কুলজীবনেই তাঁর পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন বিহার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে NIT Patna), যেখানে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হন। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি পাওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে ছিল, কিন্তু তিনি তা নেননি। আকর্ষণ ছিল অন্যদিকে—সমাজবাদী রাজনীতির প্রতি।
এই সিদ্ধান্তই তাঁকে এমন পথে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি ধীরে ধীরে ভারতের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
জেপি আন্দোলন ও রাজনৈতিক যাত্রার শুরু
নীতিশ কুমারের রাজনৈতিক পরিচয়ের সূচনা ঘটে ১৯৭০-এর দশকের জেপি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সেই সময় বিহারের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও যুব আন্দোলন তাঁর কার্যক্রম লক্ষ করে। নীতিশ দ্রুতই সমাজবাদী চেতনার এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন।
১৯৮৫ সালে তিনি প্রথমবার বিধানসভায় নির্বাচিত হন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় সাফল্য। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও গুরুত্ব পান—লোকসভার সদস্য হন এবং অটল বিহারি বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় রেল, কৃষি এবং পরিবহন মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের সময়ই নীতিশ কুমার প্রমাণ করেন যে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সিদ্ধান্তজনিত দৃঢ়তা তাঁর অন্যতম শক্তি।
প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী থেকে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব
২০০০ সালে তিনি প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন, যদিও সেই মেয়াদ ছিল মাত্র সাত দিনের। কারণ তখনকার রাজনৈতিক সমীকরণ তাঁর সরকারকে স্থায়ী হতে দেয়নি।
কিন্তু ২০০৫ সাল তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মাইলফলক হয়ে আসে। সে বছর বিহারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, দুর্নীতি ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে জনগণের আস্থা ভেঙে পড়েছিল। সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে ভোটাররা বিশ্বাস রাখেন নীতিশ কুমারের ওপর। ফলাফল—তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন এবং এরপর শুরু হয় বিহারের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি নতুন অধ্যায়।
এই সময়েই তিনি “সুশাসন বাবু” নামে পরিচিত হন।
কেন ‘সুশাসন বাবু’—পরিবর্তনের মূল অধ্যায়
২০০৫ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তাঁর প্রথম দীর্ঘমেয়াদি শাসনামলে বিহারের চিত্র আমূল বদলে যায়।
প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুসারে—
আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি
দীর্ঘদিন ধরে বিহারের অপরাধ প্রবণতা ছিল দেশের অন্যতম উদ্বেগজনক সমস্যা। নীতিশ প্রশাসন পুলিশ সংস্কার, দ্রুত বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়।
গ্রামীণ উন্নয়ন ও অবকাঠামো
গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুতায়ন ও পানীয় জল সরবরাহ—এসব খাতে বিহারে নজিরবিহীন পরিবর্তন দেখা যায়।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন
“সাইকেল ফর গার্লস” প্রকল্প শুধু নারীশিক্ষাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
EBC সম্প্রসারণ
Extremely Backward Class (EBC)-এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির জন্য তাঁর নীতি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
নীতিশ কুমার এমন একজন নেতা হিসেবে পরিচিত হন, যিনি প্রশাসনিক হিসেব-নিকেশ বুঝে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।
২০২৫ সালের নির্বাচন ও দশমবার শপথের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে NDA জোট ২০০-এর বেশি আসন পায়। এই জয়ে জেডিইউ ও বিজেপির সমন্বয় এবং প্রচারণার কৌশল মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
২০ নভেম্বর ২০২৫—নীতিশ কুমার দশমবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এই শপথের মাধ্যমে তিনি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েন।
এই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জে.পি. নাড্ডা সহ বহু কেন্দ্রীয় নেতা। উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছেলে নিশান্ত কুমারও, যিনি সাধারণত প্রকাশ্য রাজনৈতিক মঞ্চে দেখা দেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে একটি “দীর্ঘস্থায়ী আস্থার ফল” হিসেবে দেখেছেন।

দশম শপথ কেন ঐতিহাসিক?
১. ভারতের কোনো মুখ্যমন্ত্রী এতবার শপথ নেননি।
২. দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা—রাজনৈতিক দক্ষতার বড় উদাহরণ।
৩. জোট রাজনীতির অস্থিরতার মাঝেও ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা বিরল ঘটনা।
৪. প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমে তিনি স্থায়িত্ব অর্জন করেছেন।
৫. বিহারের রাজনীতিতে তার প্রভাব আজও অত্যন্ত দৃঢ়।
নেতৃত্বের শক্তি ও চরিত্র
নীতিশ কুমারের নেতৃত্ব তিনটি দিক থেকে আলাদা—
১. বাস্তববাদী রাজনীতি
যে পরিস্থিতিতে যা প্রয়োজন—সেই সিদ্ধান্ত নিতে তিনি দ্বিধা করেন না। রাজনৈতিক সমালোচনা তাঁর পরিচিত সঙ্গী হলেও তিনি রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে দক্ষ।
২. প্রশাসনিক কঠোরতা
ব্যক্তিগত সৎভাবমূর্তি ও শৃঙ্খলার প্রতি অবিচল মনোভাব তাঁকে আলাদা করে।
৩. স্থায়ী ভোটব্যাঙ্ক তৈরি
নারী ভোটার, EBC/OBC গোষ্ঠী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী—এই তিন শক্তিশালী ভিত্তি তাঁকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে।
বিতর্ক ও সমালোচনা: ‘পল্টু রাম’ মন্তব্যের ইতিহাস
নীতিশ কুমারের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক হচ্ছে তাঁর জোট পরিবর্তন।
বছরের পর বছর—
- NDA → বিরোধী জোট → আবার NDA
এই যাওয়া-আসার রাজনীতি তাঁকে বিরোধীদের কটাক্ষের মুখে পড়তে বাধ্য করেছে। অনেকেই তাঁকে “পল্টু রাম” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে তাঁর যুক্তি—“আমি যা করি, তা বিহারের স্বার্থে।”
এই বক্তব্য সবসময় সমালোচনার জবাব দিতে যথেষ্ট না হলেও, ভোটারদের একাংশ এখনো তাঁর নেতৃত্বকে গ্রহণ করেছে—এটি অস্বীকার করা যায় না।
সামনে কোন পথ—নীতিশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
দশমবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া একটি রেকর্ড হলেও, সামনে অপেক্ষা করছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ—
১. কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি
২. শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানো
৩. শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ
৪. স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার
৫. জোট রাজনীতিকে স্থিতিশীল রাখা
৬. পরবর্তী নেতৃত্বকে তৈরি করা
রাজনৈতিক মহলে এখন বড় আলোচনার বিষয়—নীতিশ কুমার কি তাঁর শেষ মেয়াদে প্রবেশ করেছেন, নাকি ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও বড় কোনও ভূমিকা নেবেন?
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
নীতিশ কুমারের রাজনৈতিক জীবন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিশেষ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
একজন ইঞ্জিনিয়ার থেকে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজ্যের দশবারের মুখ্যমন্ত্রী—এই পথচলার মাঝে রয়েছে সংগ্রাম, বিতর্ক, জোটের গণিত, উন্নয়নমূলক কাজ এবং ব্যক্তিগত অধ্যবসায়।
তাঁর দশম শপথ শুধু একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয় বরং ধারাবাহিকতার নতুন সূচনা। এখন বিহারের সামনে প্রশ্ন—এই নেতৃত্ব রাজ্যকে পরবর্তী পর্যায়ে এগিয়ে নিতে কতটা সক্ষম হবে?
নিচে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোর তালিকা দিচ্ছি:
Sources / References
- CM Profile – Government of Bihar: https://cm.bihar.gov.in/users/cmprofile.aspx (Chief Minister Webportal)
- Hon’ble Chief Minister of Bihar – Profile PDF (Bihar Vidhan Sabha): https://vidhansabha.bihar.gov.in/pdf/Chief_Minister_of_Bihar_Profile.pdf (Bihar Vidhan Sabha)
- NewsOnAir – “Nitish Kumar takes oath as Bihar Chief Minister for the 10th time” : https://www.newsonair.gov.in/jdu-chief-nitish-kumar-to-take-oath-as-bihar-cm-for-the-10th-time/ (News on Air)
- Hindustan Times – “Nitish Kumar oath-taking ceremony … for record 10th time” : https://www.hindustantimes.com/india-news/bihar-cm-oath-taking-ceremony-live-updates-nitish-kumar-samrat-choudhary-vijay-sinha-shapath-grahan-government-formation-101763599112319.html (Hindustan Times)
- Economic Times – “Ten oaths in just 25 years? This is how Nitish Kumar kept returning …” : https://m.economictimes.com/news/india/-ten-oaths-in-just-25-years-how-has-nitish-kumar-kept-returning-as-bihar-cm-heres-how-he-was-able-to-do-it-/breaking-lalu-yadavs-15year-grip-2005-onwards/slideshow/125455000.cms (The Economic Times)
- OneIndia – “Nitish Kumar: Age, Biography, Education, Wife, Caste …” : https://www.oneindia.com/politicians/nitish-kumar-40754.html (https://www.oneindia.com/)
- VoterMood – “Nitish Kumar Biography” : https://votermood.com/biography/nitish-kumar (VoterMood)