কেন মাসের সবচেয়ে অন্ধকার রাতেই করা হয় শ্রাদ্ধ ও তর্পণ?

Spread the love

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, অমাবস্যা দিনটি গ্রহ-নক্ষত্রের নির্দিষ্ট প্রভাবে বিশেষ শক্তিধর হয়ে ওঠে। চন্দ্র ও সূর্যের মিলনের কারণে সৃষ্ট এ সময়ে মানুষের মানসিক স্থিতি, আবেগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হয়।

অমাবস্যা, শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো—যেদিন আকাশে চাঁদ নেই। মাসে একবার এমন তিথি আসে যখন চাঁদ সূর্যের সঙ্গে একই রেখায় অবস্থান করে এবং পৃথিবী থেকে একেবারেই দেখা যায় না। প্রকৃতির এই ঘটনাকে ঘিরেই হিন্দুধর্মে অমাবস্যার বিশেষ তাৎপর্য গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক সাধনা, দেবী পূজা থেকে কৃষিজীবনের প্রয়োজন—অমাবস্যা নানা কারণে হিন্দু সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

প্রথমত, অমাবস্যা দিনটি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় মৃত আত্মারা পৃথিবীতে তাঁদের বংশধরদের দেওয়া অর্ঘ্য গ্রহণ করতে আসেন। তাই অনেকেই এই দিনে পিতৃতর্পণ, পিণ্ডদান ও বিশেষ পূজা করেন। পরিবারের শান্তি, অশুভ শক্তির নাশ এবং পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ লাভের আশায় অমাবস্যার দিনটি পালন করা হয়। মহালয়া অমাবস্যা এই কারণে বিশেষ বিখ্যাত, যেদিন দেবীপক্ষ শুরু হয় এবং পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ঘটে।

দ্বিতীয়ত, অমাবস্যা আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য একটি শক্তিশালী সময় হিসেবে ধরা হয়। অন্ধকারকে যেমন ভয়ংকর মনে হয়, তেমনই সেটিই ধ্যান ও আত্মশুদ্ধির জন্য উপযোগী ধরা হয়। অনেকে বিশ্বাস করেন, অমাবস্যার রাতে তপস্যা, জপ-ধ্যান এবং উপবাস করলে মন-প্রাণ শুদ্ধ হয় এবং আত্মার সঙ্গে ঈশ্বরের সংযোগ স্থাপন সহজ হয়। বহু সাধক, যোগী ও তান্ত্রিকের কাছে অমাবস্যা তাই বিশেষ সাধনার সময়।

তৃতীয়ত, দেবীর পূজা এবং বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গেও অমাবস্যা জড়িত। দক্ষিণ ভারতে বিশেষভাবে লক্ষ্মী পূজা হয় অমাবস্যার দিনে, আবার পশ্চিমবঙ্গে কালীপূজা পালিত হয় কার্তিক অমাবস্যার রাতেই। বিশ্বাস করা হয়, এই সময় শক্তিশালী দেবীরা বিশেষভাবে আবাহিত হন। শনি অমাবস্যাও আলাদা গুরুত্ব রাখে, যেদিন ভক্তরা শনিদেবের কৃপা লাভের জন্য উপবাস ও প্রার্থনা করেন।

চতুর্থত, কৃষিনির্ভর সমাজেও অমাবস্যার তাৎপর্য ছিল গভীর। চাঁদের গতিবিধি অনুযায়ী কৃষকরা বীজ বপন, ফসল কাটা বা জমির কাজে শুভাশুভ নির্ধারণ করতেন। তাই অমাবস্যা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনের যোগসূত্রের প্রতীকও হয়ে উঠেছিল।

হিন্দুধর্মে অমাবস্যা পালন করা হয় তিনটি মূল কারণে—পিতৃপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, আধ্যাত্মিক সাধনা, এবং দেবদেবীর পূজা। অমাবস্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার কখনো স্থায়ী নয়। অন্ধকারের শেষে যেমন নতুন চাঁদের আলো আসে, তেমনই মানুষের জীবনে অমাবস্যা নতুন আলোর সম্ভাবনা, নতুন সূচনার প্রতীক।

অমাবস্যা নিয়ে মানুষের মনে নানা কুসংস্কারও প্রচলিত আছে। বহু গ্রামীণ সমাজে বিশ্বাস করা হয় এই রাতে অশুভ শক্তির প্রভাব বেড়ে যায়। তাই অনেকেই ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন, মন্ত্রপাঠ করেন বা দেবীর নাম জপ করেন। এমনকি শিশুরা বাইরে না বেরোতে পরামর্শ পায়। এসব বিশ্বাস হয়তো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়, কিন্তু মানুষের মানসিক জগতে অমাবস্যা এক রহস্যময় অনুভূতি তৈরি করে।

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, অমাবস্যা দিনটি গ্রহ-নক্ষত্রের নির্দিষ্ট প্রভাবে বিশেষ শক্তিধর হয়ে ওঠে। চন্দ্র ও সূর্যের মিলনের কারণে সৃষ্ট এ সময়ে মানুষের মানসিক স্থিতি, আবেগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হয়। তাই জ্যোতিষীরা প্রায়ই বলেন, অমাবস্যার দিনে আত্মসংযম ও শান্ত মনোভাব ধরে রাখা উচিত।

অমাবস্যার আরেকটি তাৎপর্য হলো দান ও সেবার কাজ। বহু ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ আছে, অমাবস্যায় গরিবদের অন্নদান, গবাদি পশুকে খাওয়ানো বা গাছ লাগানোর মতো কাজ করলে বিশেষ পুণ্য লাভ হয়। এই দিনকে তাই শুধু উপবাস ও প্রার্থনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।

শহর ও গ্রামে এখনও দেখা যায়, বহু পরিবার অমাবস্যার দিন বাড়িতে বিশেষভাবে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধিকরণ করে, প্রদীপ জ্বালায় এবং শান্তির প্রার্থনা করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আচারগুলোর ধরন পাল্টালেও মূল ভাবনা একই—অমাবস্যা হলো ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আত্মশুদ্ধির সময়। অন্ধকারের মাঝে আলো খুঁজে নেওয়ার প্রতীক হিসেবেই অমাবস্যা হিন্দু সমাজে আজও এক বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *