স্বর্ণমন্দিরের ভেতরে রয়েছে শিখ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিব। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই গ্রন্থের পাঠ চলে, এবং ভক্তরা মনোযোগ দিয়ে তা শোনেন।
ভারতের স্বর্ণমন্দির বা শ্রী হরমন্দির সাহিব শুধু একটি স্থাপত্যকীর্তি নয়, এটি ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং মানবতার প্রতীক। অমৃতসরে অবস্থিত এই মন্দিরটি শিখ ধর্মাবলম্বীদের জন্য সর্বাধিক পবিত্র স্থান হলেও, এর দ্বার সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত। অগণিত ভক্ত এবং পর্যটক প্রতিদিন এখানে এসে কেবল প্রার্থনা করেন না, অনুভব করেন মানবতার মিলনক্ষেত্র।
স্বর্ণমন্দিরের সূচনা হয়েছিল ষোড়শ শতকের শেষদিকে। পঞ্চম শিখ গুরু, গুরু অর্জুন দেব এই মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন একজন মুসলিম সাধক, মিয়াঁ মীর, যা প্রমাণ করে যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমতার শিক্ষা এই স্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল। মন্দিরের চারদিকে চারটি দরজা রয়েছে, যার অর্থ হলো যে কোনও দিক থেকে, যে কোনও ধর্ম বা জাতির মানুষ এখানে প্রবেশ করতে পারেন। এটি এক অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে মানুষের ভেদাভেদ নয় বরং ঐক্যই মুখ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই মন্দিরের ইতিহাস শান্তিপূর্ণ ছিল না। আঠারো শতকে আফগান আক্রমণের সময় স্বর্ণমন্দির একাধিকবার ধ্বংস হয়েছিল। পরে শিখ সাম্রাজ্যের মহারাজা রণজিৎ সিং একে পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি শুধু মন্দিরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেননি, বরং সোনার আস্তরণ দিয়ে এটিকে এক অনন্য রূপ দিয়েছিলেন। সেই থেকেই মন্দিরের নাম হয় স্বর্ণমন্দির। আজকের দিনে এটি বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় এবং আধ্যাত্মিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।
স্বর্ণমন্দিরের ভেতরে রয়েছে শিখ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিব। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই গ্রন্থের পাঠ চলে, এবং ভক্তরা মনোযোগ দিয়ে তা শোনেন। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি বিশাল জলাশয়, যার নাম অমৃত সরোবর। ভক্তদের বিশ্বাস, এই জল পবিত্র এবং এটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয়।
আরেকটি অনন্য দিক হলো লঙ্গরখানা বা ফ্রি কিচেন। প্রতিদিন এখানে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে বিনামূল্যে আহার করানো হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খাবার তৈরি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সব কাজেই ভক্তরা স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে অংশ নেন। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই একসঙ্গে বসে একই খাবার গ্রহণ করেন। এই প্রথা শিখ ধর্মের মূল দর্শন সমতা ও মানবসেবার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
স্বর্ণমন্দির ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একে কেন্দ্র করে অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিশ শতকের নানা ঘটনা। তবে আজও এটি কেবল শিখ ধর্মাবলম্বীদের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
এই মন্দিরের আলোয় মানুষ খুঁজে পান আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এবং মানবতার গভীর অর্থ। ধর্ম, জাতি কিংবা সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে স্বর্ণমন্দির হয়ে উঠেছে সেই জায়গা, যেখানে সবাই সমান। তাই স্বর্ণমন্দির শুধু ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে অমূল্য সম্পদ।
স্বর্ণমন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু নাটকীয় ও করুণ অধ্যায়। উনবিংশ শতকে মহারাজা রণজিৎ সিং-এর অবদান যেমন এর সৌন্দর্যকে অমর করে তুলেছিল, তেমনি বিংশ শতকের শেষভাগে এটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালের “অপারেশন ব্লু স্টার”-এর সময় ভারতীয় সেনারা মন্দির প্রাঙ্গণে অভিযান চালায়, যার ফলে গুরুতর ক্ষতি হয় এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনাকে ঘিরে আজও শিখ ইতিহাসে গভীর বেদনা ও ক্ষোভের স্মৃতি বহমান।
মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীও এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এই মন্দিরের উপরিভাগ বিশুদ্ধ সোনার আস্তরণে ঢাকা, যা সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠে। চারপাশের অমৃত সরোবরের জলে সেই সোনালী প্রতিচ্ছবি দেখা গেলে পুরো দৃশ্যই হয়ে ওঠে অপার্থিব। রাতের বেলা আলোকসজ্জায় এর সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক পর্যটকই বলেন, স্বর্ণমন্দিরের সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখা যায় না, হৃদয়ে অনুভব করা যায়।
অমৃত সরোবর নিজেই একটি রহস্যময় তাৎপর্য বহন করে। ইতিহাস বলে, গুরু রাম দাস, যিনি অমৃতসরের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি এই পুকুর খননের কাজ শুরু করেছিলেন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই সরোবরের জল কেবল শরীর নয়, আত্মাকেও শুদ্ধ করে। বহু মানুষ এখানে স্নান করে মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে চান।
স্বর্ণমন্দির কেবল শিখ ধর্মের জন্য নয়, ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের প্রতীক। এখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ বিশ্বের নানা ধর্মের মানুষ সমবেত হন। বিশেষ উৎসবের সময়, যেমন বৈশাখী বা গুরু নানকের জন্মদিনে, লাখো মানুষ এখানে সমবেত হন। ধর্মীয় সীমারেখা ছাড়িয়ে স্বর্ণমন্দির এক অভিন্ন মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
আজকের দিনে স্বর্ণমন্দিরকে কেন্দ্র করে অমৃতসর শহরও আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন, ফলে এটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভক্তি, ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অদ্ভুত সমন্বয় স্বর্ণমন্দিরকে কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, সমগ্র মানবজাতির মিলনক্ষেত্রে পরিণত করেছে।