সৌরভের যাত্রা প্রমাণ করে, জীবনের শুরু কোথায় হলো তা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল খেলতে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটই তাঁর সত্যিকারের মঞ্চ হয়ে ওঠে।
সৌরভ গাঙ্গুলীর নাম শুনলেই প্রথমে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভারতীয় ক্রিকেট দলের এক বীর সেনাপতির ছবি। তিনি শুধু ব্যাটসম্যান নন, ভারতীয় ক্রিকেটের রূপান্তরের অন্যতম প্রধান স্থপতি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, ছোটবেলায় তাঁর প্রথম পছন্দ ক্রিকেট নয়, ফুটবল ছিল। কলকাতার মতো এক শহরে জন্মেছিলেন তিনি, যেখানে ফুটবলকে ধর্মের মতো মানা হয়। পাড়ায়, স্কুলে কিংবা ক্লাবের মাঠে—ফুটবলই ছিল সেই সময়ে কিশোরদের কাছে সবচেয়ে সহজলভ্য খেলা। সৌরভও সেই আবহে বড় হয়ে ওঠেন এবং তাঁর শৈশবের স্বপ্ন ছিল একজন দক্ষ ফুটবলার হওয়ার।
তাঁর পরিবারও ছিল ক্রীড়াপ্রেমী। সৌরভের বাবা চণ্ডী গাঙ্গুলী নিজেও ফুটবল ভালোবাসতেন। স্কুলে পড়াকালীন সৌরভ নিয়মিত ফুটবল খেলতেন এবং স্কুল টিমেরও অংশ ছিলেন। বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন প্রতিভাবান খেলোয়াড়। মাঠে তাঁর তৎপরতা এবং বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, ভবিষ্যতে হয়তো বাংলার ফুটবলে তাঁর নাম একদিন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সেই সময়ে অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি যে এই ছেলেই একদিন ক্রিকেট মাঠে ভারতকে গৌরব এনে দেবে।
তবে ভাগ্যের লেখা ছিল অন্য কিছু। সৌরভের বড় ভাই স্নেহাশিস গাঙ্গুলী তখন ক্রিকেট খেলতেন এবং ছোট ভাইকেও উৎসাহ দেন সেই খেলায় যোগ দিতে। পরিবারের প্রভাব এবং ভাইয়ের আগ্রহেই ধীরে ধীরে সৌরভ ফুটবল থেকে সরে এসে ক্রিকেটে মন দেন। শুরুতে তিনি ছিলেন ডানহাতি ব্যাটসম্যান, কিন্তু কোচ এবং ভাইয়ের পরামর্শে বাঁ-হাতে ব্যাটিং শুরু করেন। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফুটবলের মাঠ থেকে ব্যাট হাতে ওঠে আসা সৌরভ ধীরে ধীরে প্রমাণ করে দেন, তিনি অন্য লেভেলের প্রতিভা।
ক্রমে তাঁর ক্রিকেট প্রতিভা কলকাতার গণ্ডি ছাড়িয়ে গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় জাতীয় দলে জায়গা পান তিনি এবং বিশ্বকে চিনিয়ে দেন নতুন এক ভারতকে—যে ভারত চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায় না, প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করে। যদি সৌরভ গাঙ্গুলী ফুটবলার হিসেবেই থেকে যেতেন, তাহলে হয়তো ভারতীয় ফুটবলে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ হত, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাস এতটা আলাদা রূপ পেত না।
সৌরভের যাত্রা প্রমাণ করে, জীবনের শুরু কোথায় হলো তা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল খেলতে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটই তাঁর সত্যিকারের মঞ্চ হয়ে ওঠে। সেই মঞ্চেই তিনি নিজের প্রতিভার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটান এবং হয়ে ওঠেন কোটি ভক্তের হৃদয়ের দাদা।
সৌরভ গাঙ্গুলীর শৈশবের ক্রীড়া জীবনকে বোঝার জন্য তখনকার কলকাতার পরিবেশকে মনে রাখতে হবে। সত্তর এবং আশির দশকে বাংলার প্রতিটি অলিতে গলিতে ফুটবলই ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান কিংবা মহামেডান—এই তিন প্রধান ক্লাবের ম্যাচ মানেই গোটা শহরের উত্তেজনা। ছোটবেলায় সৌরভও সেই আবহে ডুবে থাকতেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে খেলতেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন বড় মঞ্চে বল পায়ের জাদু দেখানোর।
তবে তাঁর জীবনের এক বড় বাঁক আসে যখন পরিবার বুঝতে পারে ক্রিকেটেও সৌরভের অদ্ভুত প্রতিভা রয়েছে। ভাই স্নেহাশিসের সঙ্গে নিয়মিত প্র্যাকটিস করার সময় দেখা যায়, ব্যাট হাতে সৌরভের দক্ষতা আলাদা স্তরে। এর পর থেকে পরিবারও ফুটবলের বদলে ক্রিকেটকেই তাঁকে সামনে এগিয়ে নিতে উৎসাহ দিতে শুরু করে। শুরুতে তাঁর জন্য সহজ ছিল না এই বদল। ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটে মনোযোগী হওয়া মানে নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলা, নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া।
প্রথম দিকে কলকাতার ক্লাব ক্রিকেটেই সৌরভ নিজের জায়গা করে নেন। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যাটিং কৌশল, টেকনিক এবং স্বাভাবিক নেতৃত্বের গুণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। খুব তাড়াতাড়ি তিনি বাংলার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন এবং সেখান থেকে জাতীয় দলে নির্বাচিত হওয়ার পথ খুলে যায়। এক সময় যাঁকে মানুষ ফুটবল মাঠে দেখতে চেয়েছিল, তিনি হয়ে উঠলেন ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ওপেনার এবং পরবর্তীতে এক দৃঢ় মানসিকতার অধিনায়ক।
আজ পিছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সৌরভ গাঙ্গুলীর ফুটবল মাঠে শুরু করা যাত্রাই তাঁকে ক্রিকেটে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তুলেছিল। ফুটবলের ফিটনেস, দৌড়ঝাঁপ আর প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার মানসিকতা তাঁকে ক্রিকেটেও অন্যরকম দৃঢ়তা এনে দিয়েছিল। হয়তো তাই তিনি সবসময় খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন। ফুটবল থেকে ক্রিকেটে এই রূপান্তরই তাঁকে তৈরি করেছে সর্বাঙ্গীণ এক ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে।