মহাত্মা গান্ধী, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী নেতা, ছিলেন নিঃসন্দেহে একজন পিতার মতোও। তিনি রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি পরিবার এবং সন্তানদের প্রতি যত্নশীল ছিলেন। তাঁর ছয় সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে হারিলাল গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রায়শই ইতিহাসে আলোচিত হয়। যদিও গান্ধীজি সব সন্তানকে সমানভাবে ভালোবাসতেন, তবুও হারিলালের সঙ্গে তাঁর আবেগিক সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ।
হারিলাল গান্ধী: মহাত্মার প্রিয় সন্তান ও নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন!
হারিলাল গান্ধী ছিলেন বড় ছেলে এবং প্রায়শই পিতার রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শের প্রভাব অনুভব করতেন। মহাত্মা গান্ধী হারিলালের শৈশব ও কৈশোরে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ এবং শিক্ষার প্রতি গভীর মনোযোগ দিতেন। তিনি চাইতেন হারিলাল নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং দেশপ্রেমিক হোক। তবে হারিলালের জীবন রাজনৈতিক অঙ্গনের চাপে ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে বিভিন্ন দিক দিয়ে চ্যালেঞ্জপূর্ণ ছিল। এই কারণে পিতার ও ছেলের মধ্যে সময়ে সময়ে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, তবে এটি তাদের আবেগিক বন্ধনকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়নি।
গান্ধীজির Diaries এবং বিভিন্ন আত্মজীবনীতে দেখা যায়, তিনি ছেলেদের সঠিক পথে পরিচালনা করতে চাইতেন। হারিলাল কখনও কখনও পিতার আদর্শ মেনে চলতে ব্যর্থ হলেও গান্ধীজির দৃষ্টিতে তিনি সন্তানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। পিতার দৃষ্টিকোণ থেকে হারিলাল ছিল একজন প্রতিভাবান, যার মধ্যে দেশপ্রেম ও নৈতিকতা গড়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল।
পরিবারিক জীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের চাপের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী সবসময়ই সন্তানের কল্যাণ ও তাদের নৈতিক বিকাশের দিকে মনোযোগী ছিলেন। হারিলালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই দিকের সবচেয়ে প্রামাণিক উদাহরণ। তাদের মধ্যে সৃষ্ট সেই আবেগিক বন্ধন ভারতীয় ইতিহাসে পিতৃত্ব এবং সন্তানত্বের একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে গেছে।
গান্ধীজি সব সন্তানদের প্রতি সমানভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করলেও ইতিহাসের আলোকে হারিলাল গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে প্রায়শই “প্রিয় সন্তান” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত আবেগের প্রতিফলন নয়, একটি পিতার আদর্শ ও দায়িত্বশীলতার চিত্রও ফুটিয়ে তোলে।
হারিলাল গান্ধীর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত আবেগের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দেওয়ার এক অংশ। গান্ধীজি সবসময় সন্তানদের নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিতেন এবং হারিলালকে নিয়মিতভাবে নৈতিক শিক্ষা ও দেশপ্রেমের মূল্য বোঝাতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য ও অহিংসার মূলনীতি যদি সন্তানদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তারা সমাজ ও দেশের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
হারিলালের জীবনকাল বিভিন্ন চ্যালেঞ্জে ভরা ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পিতার আদর্শ মেনে চলতে ব্যর্থ হলেও, গান্ধীজি কখনও তাঁর প্রতি প্রেম ও করুণার দৃষ্টি হারাননি। ইতিহাসে দেখা যায়, এমন সময়েও গান্ধীজি হারিলালের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর দুঃখ ও ভুল বোঝাপড়া মেটাতে চেষ্টা করেছেন। এই দিকটি দেখায় যে গান্ধীজির প্রিয় সন্তান সম্পর্ক শুধুমাত্র আবেগিক নয়, বরং একটি পিতার ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার পরিচয়।
গান্ধীজির Diaries এবং পারিবারিক নথিতে অনেকবার হারিলালের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি তার পিতার আদর্শ মেনে চলার চেষ্টা করেছিলেন, তবে রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপে এবং ব্যক্তিগত দুর্বলতার কারণে অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছেন। গান্ধীজি এই ব্যর্থতাকে শাস্তি হিসেবে দেখতেন না, বরং শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতেন। তিনি চাইতেন হারিলাল নিজের ভুল থেকে শিখে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হোক।
সন্তানদের প্রতি গান্ধীজির এই ধরনের আন্তরিকতা ও যত্নের কারণে হারিলালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গভীরতা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এটি শুধু একজন পিতার ভালোবাসার উদাহরণ নয়, ইতিহাসের একটি মূল্যবান শিক্ষা দেয় যে, কঠোর আদর্শ এবং সহমর্মিতা একসাথে সন্তানের বিকাশে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হারিলাল গান্ধী ও মহাত্মা গান্ধীর সম্পর্ক আজও পিতৃত্ব এবং নৈতিকতার এক অনন্য চিত্র হিসেবে স্মরণীয়।