চ্যাটজিপিটি-৫ আত্মপ্রকাশের পর প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন টেসলা ও এক্স মালিক এলন মাস্ক। তাঁর দাবি, ওপেনএআই এতটাই দ্রুত ও শক্তিশালীভাবে এগোচ্ছে যে, শেষ পর্যন্ত এটি মাইক্রোসফটকেই “গিলে ফেলবে”। এই মন্তব্য সরাসরি মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলাকে উদ্দেশ করে করা হয়েছে, যা প্রযুক্তি মহলে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। মাস্কের বক্তব্যে অনেকেই সম্ভাব্য বাজার প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।
ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মাইক্রোসফট বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ওপেনএআই-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিজের পণ্যে একীভূত করছে। চ্যাটজিপিটি-৫ এর মতো উন্নত ভাষা মডেল বাজারে আসায় মাইক্রোসফটের সার্চ ইঞ্জিন বিং থেকে শুরু করে অফিস সফটওয়্যারের মতো সেবা আরও স্মার্ট হচ্ছে। তবে মাস্কের মতে, এই উন্নতির ধারা এতটাই শক্তিশালী যে, এক সময় ওপেনএআই নিজস্ব ক্ষমতায় মাইক্রোসফটের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে।
মাস্কের মন্তব্যে সত্য নাদেলা অবশ্য পালটা জবাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ওপেনএআই-এর উন্নতি মাইক্রোসফটেরই একটি সাফল্য, কারণ প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। নাদেলা জোর দিয়ে বলেন, এই অংশীদারিত্ব উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক, এবং এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে আরও দ্রুত হবে।
প্রযুক্তি মহলের বিশ্লেষকদের মতে, মাস্কের এই মন্তব্য হয়তো প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করার কৌশল, আবার অনেকে মনে করছেন, এটি কেবল একটি রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য হলেও এর ভেতরে বাস্তবতার আভাস রয়েছে। কারণ, এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম, যা বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চ্যাটজিপিটি-৫ শুধু প্রযুক্তিগতভাবে নয়, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নতুন তরঙ্গ তুলেছে। এলন মাস্কের মন্তব্য ও সত্য নাদেলার পালটা জবাবের ফলে এআই জগতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়ে গেল।
চ্যাটজিপিটি-৫-এর আগমন এআই জগতে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। ভাষা বোঝা, বিশ্লেষণ, যুক্তি প্রয়োগ এবং সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরির ক্ষমতায় এই মডেল আগের সব সংস্করণকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এটি শুধু প্রযুক্তি খাতে নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা, এমনকি বিনোদন শিল্পেও বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এই সাফল্যের মূল উৎস ওপেনএআই-এর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও ডেটা প্রশিক্ষণ, যার একটি বড় অংশে মাইক্রোসফটের আর্থিক সহায়তা ও অবকাঠামো ভূমিকা রেখেছে।
তবে এলন মাস্কের বক্তব্যের পেছনে কিছু ব্যক্তিগত ও পেশাগত প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ওপেনএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন মাস্ক, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সংস্থা থেকে সরে যান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নিজস্ব প্রকল্পে মনোযোগ দেন। সম্প্রতি তিনি ‘xAI’ নামে নিজস্ব এআই কোম্পানি গড়ে তুলেছেন, যা সরাসরি ওপেনএআই-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাজ করছে। ফলে তাঁর মন্তব্য অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাপ ও প্রচারের অংশ হিসেবে দেখছেন।
প্রযুক্তি বাজারে মাইক্রোসফটের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম, অ্যাজুর ক্লাউড সেবা এবং কর্পোরেট সফটওয়্যার সলিউশন তাদের আয় ও প্রভাবের বড় উৎস। ওপেনএআই-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও, মাইক্রোসফটের বিস্তৃত পণ্যের বাজার ও গ্রাহকভিত্তি এমন যে, কোনো একক প্রযুক্তি কোম্পানির পক্ষে তাকে ‘গিলে ফেলা’ সহজ নয়। তবুও, এআই যদি আগামী দশকে প্রযুক্তি জগতের প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাইক্রোসফট ও ওপেনএআই-এর সম্পর্ক এখনো পারস্পরিক লাভের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মাইক্রোসফট ওপেনএআই-এর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের সেবা উন্নত করছে, আর ওপেনএআই মাইক্রোসফটের বিশাল অবকাঠামো ও বাজার শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। ভবিষ্যতে যদি এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তবেই মাস্কের সতর্কবার্তার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আপাতত, চ্যাটজিপিটি-৫ কেবল প্রযুক্তির নয়, ব্যবসারও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।