২০৩০-এ কিবোর্ড-মাউস বিদায়, মানুষের মতোই কথা বলবে কম্পিউটার!

Spread the love

২০৩০ সালের মধ্যে কম্পিউটার প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা মানুষের সঙ্গে মেশিনের সম্পর্কের ধরণই বদলে দেবে। মাইক্রোসফটের শীর্ষ কর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের কম্পিউটার হবে মানুষের মতোই যোগাযোগক্ষম, যেখানে কিবোর্ড বা মাউসের প্রয়োজন থাকবে না। ব্যবহারকারীর মুখের কথা, হাতের অঙ্গভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি এবং এমনকি মুখের অভিব্যক্তি দিয়েই ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এই প্রযুক্তি কম্পিউটারকে শুধু নির্দেশনা গ্রহণকারী যন্ত্রের অবস্থান থেকে বের করে এনে এমন এক সঙ্গীতে রূপ দেবে, যা আমাদের চাহিদা বুঝে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

ভবিষ্যতের এই কম্পিউটার উন্নত সেন্সর, ক্যামেরা ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তির সাহায্যে চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। ডিপ লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল বিশ্লেষণ করে এটি বস্তু, মানুষ এমনকি আবেগও শনাক্ত করবে। ব্যবহারকারী ক্লান্ত থাকলে হয়তো এটি বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেবে, কিংবা কোনো মিটিং চলাকালীন অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিতে সক্ষম হবে।

শুধু দেখা নয়, এই কম্পিউটার শুনতেও পারবে এবং মানুষের ভাষা স্বাভাবিকভাবে বুঝবে। বর্তমান ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টগুলো যেমন সীমিত পরিসরে কাজ করে, তার বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের মেশিন কথোপকথনের প্রেক্ষাপট ও আবেগও অনুধাবন করতে পারবে। কেউ যদি বলে, “আজ মনটা ভালো নেই”, কম্পিউটার হয়তো তখনই এমন কিছু সাজেশন দেবে যা মন ভালো করে দিতে পারে। এটি শুধু তথ্য সরবরাহকারী নয়, বরং অভ্যাস, পছন্দ ও প্রয়োজন মনে রেখে প্রতিবারই ব্যক্তিগতকৃত প্রতিক্রিয়া দেবে।

যোগাযোগের ধরনও হবে মানবিক। কম্পিউটার মানুষের মতো কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, শব্দের ব্যবহার ও বিরতি নকল করে কথা বলবে, যাতে শোনা স্বাচ্ছন্দ্যকর হয়। প্রয়োজন হলে মুখে হাসি বা অন্য ভিজ্যুয়াল অভিব্যক্তিও প্রদর্শন করবে, যা ইন্টারফেসকে আরও বন্ধুসুলভ করে তুলবে। এই ধরনের বৈশিষ্ট্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও গ্রাহকসেবায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মনোযোগ ও বোঝার ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। চিকিৎসায় রোগীর মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও শারীরিক নড়াচড়া বিশ্লেষণ করে দ্রুত রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করবে। অফিসে মিটিং পরিচালনা, নোট নেওয়া, ডেটা বিশ্লেষণ—সব কিছুই প্রাকৃতিক উপায়ে হবে। বিনোদনের জগতে গেমিং, সিনেমা ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অভিজ্ঞতা হবে আরও বাস্তবসম্মত।

তবে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে চ্যালেঞ্জও থাকবে। ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষা বড় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, কারণ কম্পিউটারকে শুনতে, দেখতে ও বুঝতে হলে অনেক ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। হ্যাকিং ও অপব্যবহারের ঝুঁকিও থাকছে। এছাড়া উন্নত সেন্সর ও প্রসেসিং ক্ষমতা সম্পন্ন ডিভাইস তৈরি ও সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে না। প্রথম দিকে এই প্রযুক্তি হয়তো কেবল ধনী দেশগুলিতেই বিস্তার লাভ করবে, ফলে প্রযুক্তিগত বৈষম্য বাড়তে পারে।

কর্মক্ষেত্রেও বড় প্রভাব পড়বে। অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় কিছু পেশা বিলুপ্ত হতে পারে, আবার নতুন ধরনের পেশা ও দক্ষতার চাহিদাও তৈরি হবে। সামাজিকভাবে এটি মানুষ ও মেশিনের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি করবে, যা একদিকে সহযোগিতার অনুভূতি বাড়াবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের প্রাকৃতিক সামাজিক দক্ষতাকে কমিয়ে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০৩০ সালের কম্পিউটার কেবল যন্ত্র থাকবে না, বরং হবে মানুষের মতো এক সহযোগী, যে আমাদের কাজ সহজ করবে, কথা বলবে, শুনবে এবং দেখবে। মাইক্রোসফটের ঘোষিত প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে শুরু হবে এক মানবিক-প্রযুক্তিগত সহাবস্থানের যুগ, যা যেমন অসীম সম্ভাবনা এনে দেবে, তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেবে। এখন থেকেই প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি, যাতে এই পরিবর্তন মানবকল্যাণে সর্বাধিক কাজে লাগানো যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *