পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পুরুলিয়া জেলা প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাহাড়-জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি ও লোকশিল্প ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। নিচে পুরুলিয়া জেলার পাঁচটি দর্শনীয় স্থান এবং তাদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো:
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার এই ৫টি জায়গা জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন।
১. অযোধ্যা পাহাড় (Ajodhya Hills)
অযোধ্যা পাহাড় পুরুলিয়া জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। এটি ছোটনাগপুর মালভূমির একটি অংশ এবং মূলত ঘন জঙ্গল ও পাথুরে পাহাড়ে ঘেরা একটি মনোরম অঞ্চল। ট্রেকিং, রক ক্লাইম্বিং এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের জন্য এটি উপযুক্ত জায়গা। এখানে রয়েছে খৈরাবেড়া বাঁধ, মার্বেল লেক, বামনি জলপ্রপাত, যা ভ্রমণকারীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
এই অঞ্চলের সঙ্গে রামায়ণের সংযোগ রয়েছে—জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রী রাম ও সীতা বনবাসকালে এখানে কিছুদিন বাস করেছিলেন। সেই থেকেই এর নাম “অযোধ্যা পাহাড়”।
২. চরিদা গ্রাম (Charida Village)
চরিদা, অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম, যা প্রধানত মুখোশ তৈরির জন্য বিখ্যাত। এখানেই জন্ম নিয়েছে বাংলার অন্যতম বিখ্যাত লোকনৃত্য “ছৌ”-র মুখোশ। এই মুখোশগুলো কাঠ ও কাগজ-মাটি দিয়ে হাতে তৈরি করা হয়, এবং রঙিন অলঙ্করণে সাজানো হয়।

চরিদা গ্রামে গেলে পর্যটকরা সরাসরি শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, দেখতে পারেন কিভাবে ছৌ মুখোশ তৈরি হয় এবং সেগুলো কিনতেও পারেন। এটি শুধুমাত্র পর্যটনের স্থান নয়, বরং বাঙালির লোকশিল্পের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা।
৩. ঝালদা ও গড়পঞ্চকোট (Garpanchkot)
গড়পঞ্চকোট হল ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এটি পুরুলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত এবং পঞ্চকোট রাজাদের প্রাচীন দুর্গ এবং ধ্বংসাবশেষ নিয়ে সমৃদ্ধ। এখানে পুরনো মন্দির, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ এবং ছোট পাহাড়-ঘেরা অরণ্য পর্যটকদের এক ঐতিহাসিক পরিবেশে নিয়ে যায়।
এটি একাধারে ঐতিহাসিক স্থান, আবার প্রাকৃতিকভাবে শান্তিপূর্ণ। কাছাকাছি পাঞ্চেত বাঁধ এবং ড্যাম এলাকাও দর্শনীয়, যেখানে পর্যটকেরা বোটিং ও পিকনিকের জন্য ভিড় করেন।
৪. বামনি জলপ্রপাত (Bamni Falls)
অযোধ্যা পাহাড়ের এক গা-ছোঁয়া সৌন্দর্য বামনি জলপ্রপাত। এটি একটি পাহাড়ি ঝর্ণা যা গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। জলপ্রপাতটি ঘন জঙ্গলের মাঝে পড়ে, তাই হেঁটে বা ট্রেক করে যেতে হয়। এই যাত্রার মধ্যেই প্রকৃতি ভালোবাসার আনন্দ।

এটি পিকনিক ও একদিনের ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত এবং ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গরাজ্য বলা যায়। ঝর্ণার ধার ঘেঁষে বসে থাকার অনুভূতিই আলাদা।
৫. মহতোডি (Matha Forest & Dam)
মহতোডি অঞ্চলটি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও, ভীষণভাবে নির্জন এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে স্বর্গ। এটি একটি গভীর জঙ্গল ও জলাধার সংলগ্ন অঞ্চল, যা মূলত অযোধ্যা পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে পড়ে। এখানে মহতোডি বাঁধ, নদী, পাথরের গুহা ও ছোট পাহাড়ি ঝর্ণা রয়েছে।
এই জায়গাটি ক্যাম্পিং এবং ট্রেকিংয়ের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। প্রাকৃতিক নীরবতা, পাখির ডাক, আর পাহাড়ি হাওয়া এখানে এক স্বতন্ত্র পরিবেশ তৈরি করে।
পুরুলিয়া শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি বাঙালির লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও কৃষ্টির মিশ্রণে এক অনন্য অঞ্চল। এখানকার প্রতিটি স্থান যেন নিজস্ব গল্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—চরিদার মুখোশ, গড়পঞ্চকোটের ধ্বংসস্তূপ, অযোধ্যা পাহাড়ের পৌরাণিক ইতিহাস—সব মিলিয়ে পুরুলিয়া এক রঙিন মায়ার জগৎ। যারা প্রকৃতি, লোকশিল্প ও ইতিহাস ভালোবাসেন, তাদের জন্য পুরুলিয়া একবার নয়, বারবার ফিরে আসার মতো স্থান।