কেন দেবাদিদেব মহাদেবকে ‘মহাকাল’ বলা হয়?

Spread the love

হিন্দু দর্শনে শিবের যে বহু রূপ রয়েছে, তার মধ্যে ‘মহাকাল’ রূপটি সবচেয়ে গম্ভীর, গূঢ় এবং দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ। এই নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সময়, সৃষ্টি ও বিনাশের রহস্য। ‘মহাকাল’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘মহান কাল’ বা এমন এক সত্তা যিনি সময়ের ঊর্ধ্বে। শিব কেবল সময়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হন না, বরং সময়কেও ধারণ করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রয়োজন হলে বিনাশও করেন। এই ব্যতিক্রমী ক্ষমতার জন্যই তাঁকে বলা হয় ‘মহাকাল’।

হিন্দু ত্রিমূর্তির ধারণায় দেখা যায়, ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু তা রক্ষা করেন আর শিব ধ্বংস করেন। কিন্তু শিবের ধ্বংস মানে কেবল সমাপ্তি নয়, বরং তা এক নবজন্মের সূচনা। এই ধ্বংসচক্রের মাধ্যমে পুরনো ও দুর্বলতাকে সরিয়ে নতুন, শুদ্ধ এবং বলিষ্ঠ কিছু নির্মাণের পথ খুলে দেওয়া হয়। ফলে শিব হলেন সময়চক্রের এমন এক অংশ, যিনি তার অন্তিম সিদ্ধান্তকর্তা। তিনিই সময়কে শেষ করেন এবং আবার সেই শূন্যতা থেকেই নতুন সময়ের জন্ম দেন। এ কারণেই তাঁকে বলা হয় ‘মহাকাল’—সময় যাঁর হাতে শুরু হয়, আবার যাঁর ইচ্ছায় শেষও হয়।

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী দেবাদিদেব মহাদেবের ‘মহাকাল’ নামের নেপথ্যে বিস্তারিত বিবরণ।

পুরাণে শিবের ‘মহাকাল’ রূপের উল্লেখ আছে। একবার উজ্জয়িনীতে চণ্ডাসুর নামে এক শক্তিশালী অসুর ভয়ঙ্কর তাণ্ডব চালাতে থাকে। তখন দেবতারা ভীত হয়ে শিবের কাছে প্রার্থনা করেন। সেই সময় শিব ‘মহাকাল’ রূপ ধারণ করে চণ্ডাসুরকে বিনাশ করেন। এই ঘটনাই উজ্জয়িনীতে মহাকালেশ্বর রূপে শিবের পূজার সূচনা করে। কালক্রমে এই স্থান সময় এবং ধ্বংসের কেন্দ্র হিসেবে পূজিত হতে শুরু করে। ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসেও উজ্জয়িনীর স্থান অনন্য। এখান থেকেই একসময় সময়ের গণনা শুরু হতো, তাই ‘মহাকাল’ রূপের সঙ্গে এই শহরের গভীর সম্পর্ক।

শিব কেবল ধ্বংসের দেবতা নন, তিনি ‘ধ্যানমগ্ন যোগী’ও। কৈলাসে বসে যিনি সকল সংসারিক মোহ ও সময়ের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে ধ্যান করছেন, তিনি সময়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হন না। বরং তিনিই সময়ের সীমার বাইরে এক অনন্ত অস্তিত্ব। এই রূপেই তিনি ‘মহাকাল’—অবিনশ্বর, অনন্ত এবং কালাতীত এক মহাসত্তা। এই শিব সময়ের নয়, সময় তাঁকে অনুসরণ করে। তিনি জন্মান না, মৃত্যুবরণও করেন না, তাই সময়ের নিয়মেও বাঁধা পড়েন না।

শিবের ‘কালভৈরব’ রূপও এই সময়বোধের এক গভীর ব্যাখ্যা দেয়। ভৈরব হলেন সেই রুদ্ররূপ, যিনি সময়কেই গ্রাস করেন। তাঁর অস্ত্র, রূপ ও আচরণ ভয়ংকর হলেও, তাঁর উদ্দেশ্য মানুষের জীবন থেকে সময়ভীতিকে দূর করা। কালভৈরব রূপে শিব মৃত্যুর ভয়কে জয় করার শক্তি প্রদান করেন। তাই ভক্তরা তাঁর এই রূপের আরাধনা করে সাহস, স্থিতি ও চিত্তশুদ্ধির জন্য।

তন্ত্রশাস্ত্রে শিব ও শক্তির মেলবন্ধনেও মহাকাল রূপের ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিব সেখানে পুরুষতত্ত্ব এবং শক্তি প্রকৃতিতত্ত্ব। মহাকালী যখন সর্বনাশা রূপে প্রকাশ পায়, তখন তিনি এক পায়ে শিবের উপর দাঁড়ান। সেই শিব নীরব, স্থির, নির্জীব—এমন এক অস্তিত্ব, যাঁর মধ্যে সময় থমকে যায়। এই মুহূর্তে শিব আর শক্তি মিলেই সময়, সৃষ্টি ও ধ্বংসের মূল চক্রকে সম্পূর্ণ করে।

শিবের ‘মহামৃত্যুঞ্জয়’ রূপও ‘মহাকাল’ রূপের একটি দার্শনিক প্রকাশ। এখানে তিনি কেবল সময়ের অধিপতি নন, মৃত্যুরও বিজয়ী। এই রূপে শিব ভক্তকে সময় ও মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্ত করেন। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের মধ্যেই সেই শক্তির প্রতি আবেদন করা হয়—যিনি মৃত্যুর বন্ধন কাটিয়ে মোক্ষের পথ দেখান। শিব এখানে কেবল দেবতা নন, বরং চেতনার এমন এক স্তর, যেখানে মৃত্যু, ভয় ও সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে।

‘মহাকাল’ রূপে শিব তাই কেবল একজন প্রলয়কারী নন, বরং এক দার্শনিক সত্য, যিনি সময়ের সীমা ছাড়িয়ে অনন্ত অস্তিত্বের প্রতীক। তাঁর অস্তিত্বেই সময়ের জন্ম, তাঁর সংকেতেই সময়ের প্রলয়। তিনিই চক্রের কেন্দ্রবিন্দু, যাঁর ঘূর্ণনের মধ্য দিয়েই জীবন ও মৃত্যু আবর্তিত হয়। এই উপলব্ধি থেকে, শিবের মহাকাল রূপ ভক্তের কাছে এক আশ্রয়, এক চূড়ান্ত সত্য, যাঁকে উপলব্ধি করলেই সময়ের জাল কেটে যায়, ভয় হারিয়ে যায়, এবং আত্মা মুক্তির দিকে এগিয়ে চলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *